The Mistake [প্রথম পর্ব]

[ক্রাইম, সাইন্স ফিকশন এবং রোমান্সের সমন্বয়ে রচিত ধারাবাহিক গল্প]
ডিসক্লেইমারঃ এই গল্পে ব্যবহৃত সমস্ত স্থান, চরিত্র ও কাহিনী কাল্পনিক মস্তিষ্কের অবদানমাত্র। কারো চরিত্র কিংবা কোন ঘটনার সাথে মিলে গেলে তা কাকতালীয় ঘটনামাত্র। এর জন্য লেখক দায়ী নন।

প্রথম পর্ব

ট্রীনেট গ্রামের সবচাইতে বড় হাইওয়ে, ওয়ে সিক্স জিরো ফাইভ। ফোর গিয়ারে ছুটছে সালমান খানের গাড়িটা। এই রাস্তার একমাত্র বাসষ্ট্যান্ড বি-সিক্সে এসে পৌঁছলো সে। ব্রেক করে দাঁড়িয়ে গেল তার গাড়ি। গাড়ি থেকে নেমে এসে পাশের একটি সিগারেটের দোকানে ঢুকে বললো, “বেনসন অ্যান্ড হেজেস।” এটি বাসের একমাত্র দোকান কাম রেঁস্তোরা। সালমান ভিতরে ঢুকে খাবারের অর্ডার দিলো। খেয়েদেয়ে বিশ্রাম নিতে লাগলো সে যথারীতি টেবিলে বসেই। এই ফাঁকে আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে নিতে ভুললো না।
রেঁস্তোরাটা ছোটখাট। বাসষ্ট্যান্ডের ছাউনির নিচে দাঁড়ানো অপেক্ষমান যাত্রীদেরকে ভিতর থেকেই দেখা যাচ্ছে। এখন সময় সকাল আটটা একান্ন মিনিট। সকল যাত্রী সকাল নয়টার বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। ট্রীনেট এক্সপ্রেস নামক বিশাল এক বাস সার্ভিস। বি-সিক্স হচ্ছে ওটার ছয় নম্বর স্ট্যান্ডিং ষ্টেশন। মোট বারোটা ষ্টেশন পার হয়ে তারপর ওটা শহরের দিকে যায়। এই বাস সার্ভিসের প্রথম বাসটি রাস্তায় নামে সকাল সাতটায়। বারোটা ষ্টেশন পার করে গ্রাম ছাড়তে ছাড়তে এগারোটা বেজে যায়। তারপর ট্রীনেটের সবচাইতে কাছের শহর পেকিনোতে পৌঁছে দুই ঘন্টা পর।
সালমান খান। ট্রীনেটের বাসিন্দা। ভার্সিটি পাশ বেকার। হি থিঙ্কস হি ডাজন’ট নিড টু ডু এনিথিং। বড়লোক বাবা। এমনিতেই জীবন চলে যাবে। আজ শুক্রবার। সালমানের ট্যুর ডে। প্রতি শুক্রবার সালমান পুরো ট্রীনেট গ্রাম এলাকা ঘুরে বেড়ায়। তারই ধারাবাহিকতায় আজও সে বেরিয়েছে।

আঊহ্! চিৎকার করে উঠলো সালমান। আনমনা হয়ে বাস কাউন্টারে দাঁড়িয়ে থাকা এক সুন্দরী মেয়ের দিকে তাকিয়ে ছিল সে। আর এদিকে হাতে ধরে রাখা সিগারেটের আগুন এসে তর্জনী ও মধ্যমা আঙ্গুলের মাঝে এসে লেগে গেছে। কুদৃষ্টির ফল!
ওয়েটার ছুটে এলো। “কি হয়েছে স্যার?” জিজ্ঞেস করলো ওয়েটার। খেঁকিয়ে উঠলো সালমান, “কি আবার হবে! তোমাদের সিগারেটগুলো সব নকল। তাড়াতাড়ি পুড়ে যায়!” অর্থহীন কথা। তবে ওয়েটার কিছু না বলে আঙ্গুলের দিকে লক্ষ্য করে স্যাভলন অ্যান্টিস্যাপটিক ক্রিম নিয়ে এলো।
পোড়া স্থানে মলম লাগিয়ে উঠে যাবার সময় অসাবধানতাবশতঃ সালমানের চশমার গ্লাসে খানিকটা মলম লেগে গেল। আর যায় কোথায়, এমনিতেই সালমানের মেজাজ খারাপ ছিল। এই ঘটনায় মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে উঠলো। সে ওয়েটারের গালে ঠাস করে একটা চড় মেরে বসলো। আর মুখে বকাবকি করতে লাগলো।
পাঁচ মিনিট পর রেঁস্তোরা থেকে বের হয়ে এলো সালমান। এমনিতে সে এতো বদমেজাজী না। তবে আজকের ব্যাপারটা ভিন্ন। আজ একই ঘটনা তিনবার ঘটেছে। সিগারেটের আগুন হাতে লেগে যাওয়া। যা আর কখনোই হয়নি। এই দুর্ঘটনার কারণও একই।
তিন নম্বর ষ্টেশনের হোটেলে বসে এক সুন্দরী মেয়ে তাঁর দৃষ্টি কাড়ে। সিগারেট হাতে আনমনা হয়ে তাকিয়ে থাকায় ওর হাতে আগুন লেগে যায়। চার নম্বর ষ্টেশন ও পাঁচ নম্বর ষ্টেশনে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। এতে সালমান হতবাক।
বাস আসলো। সালমান রেঁস্তোরা থেকে বের হয়ে সোজা তার গাড়ির দিকে রওনা হলো। এমন সময় তাঁর চোখে পড়লো সেই রহস্যময় মেয়েটি। “মেয়েরা নাকি ছেলেদের মনে আগুন লাগায়। আর এই একজন লাগিয়েছে হাতে। তাও তিন তিনবার। এক্সটারনাল অ্যাকশন!” তিক্ত হাসি হাসলো সালমান।

বাস চলে গেল। সালমান খালি কাউন্টার পেরোনোর সময় হঠাৎ রিঙ হবার শব্দে থমকে দাঁড়ালো। আশেপাশে কেউ নেই। খালি ষ্টেশনে রিঙ বাজছে। নিশ্চিত কেউ ভুল করে মোবাইল ফেলে গেছে। সালমান খুঁজে বের করলো কালো রঙের অ্যান্টেনাসহ একটি হ্যান্ডসেট। তবে তাতে ফোনকারীর নম্বর প্রদর্শিত হচ্ছে না। যাই হোক, সালমান রিসিভ করলো।
-হ্যালো।
=হ্যালো সালমান বলছেন?
অবাক হয়ে গেল সালমান। তাকেই চাচ্ছে যে! কিন্তু ফোন তো তার না। যাই হোক, সে কথা চালিয়ে গেল।
-কে বলছেন?
=স্যার, আমি জিরো জিরো সেভেন বলছি। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ আমার মালগুলোকে পাচার করতে রাজি হবার জন্য। তবে স্যার, একটু সমস্যা হয়ে গেছে। আমি আপনাকে এক কোটি টাকা দিতে পারছি না। আমার সর্বোচ্চ সাধ্যানুযায়ী আমি ষাট লাখ টাকা জোগাড়ে সক্ষম হয়েছি। এর বেশি আমার পক্ষে…
-দেখুন আমি…বলতে গেল সালমান।
=স্যার প্লীজ, আমার কথা শুনুন। আমার পক্ষে এক কোটি টাকা দেয়া কোনক্রমেই সম্ভব নয়। আমি….
-দেখুন আপনি যাকে চাচ্ছেন আমি সেই সালমান…..
=হ্যালো, আপনি কি সালমান নন?
-হ্যাঁ আমি সালমান। কিন্তু….
=কিন্তু এতো কম টাকা নিতে রাজি নন এই তো? স্যার প্লীজ। আপনি আমাকে হতাশ করবেন না।
সালমান চুপ করে থাকলো। কি বলবে বুঝতে পারছে না। অপ্রস্তুত।
তার এই চুপ করে থাকাকে অপরপ্রান্ত হ্যাঁ-বোধক ধরে নিয়ে বলা শুরু করলো কীভাবে কোথায় টাকা পাওয়া যাবে। আর সালমান চুপ করে শুনে গেল।

পুরো ত্রিশ সেকেন্ড থ’ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার পর সালমান গাড়ীর দিকে এগিয়ে গেল। হাতের মোবাইলটা খুলে সিমটা নিয়ে নিল। ঠিক করলো, টাকাটা হাতিয়ে নেবে। তার বাবা তাকে যথেষ্ট টাকা দেন কিন্তু তার আবার হিসাবও নেন। তাই বাড়তি খরচ সম্ভব হয় না। ফাও ষাট লাখ টাকা পেলে…ঊফ্…আর ভাবতে পারলো না সালমান। সে প্রফুল্ল মনে গাড়ীর দিকে এগিয়ে চললো। সে নিশ্চিত, আর কিছুদিনের মধ্যেই সে ষাট লাখ টাকার মালিক হতে যাচ্ছে।

ফুডস জোন, হাইওয়ে নাইনটি এইট, পেকিনো।
মঙ্গলবার রাত আটটা ত্রিশ মিনিট। জিরো জিরো সেভেনের রোডম্যাপ অনুযায়ী আর ত্রিশ মিনিট পরই সামনে অবস্থিত একটি হাতীর ভাষ্কর্যের নীচে পাওয়া যাবে নীল রঙের ব্যাগ ভর্তি ষাট লাখ টাকা।
সে গাড়িতে বসে রইলো। গাড়ি রাস্তার পাশে পার্ক করা। একটি বিশেষ কারণে জনসাধারণ সবাই বাসায় চলে যাওয়ায় হাইওয়ে সাড়ে আটটায়ই খালি। চারিদিক নীরব। সালমানের মনে হচ্ছে সে একটা অপরাধ করতে যাচ্ছে। আর তাই এই নীরবতাকে তার ভয় হচ্ছে। তার মনে হচ্ছে রাস্তার দুই পাশের বিশালাকার গাছগুলো যেন অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে তাকে লক্ষ্য করছে। সে মনে মনে খুব ভয় পেল। সব অপরাধীই কি অপরাধ করার আগ মুহুর্তে এমন ভীত-সন্ত্রস্ত থাকে? প্রশ্নটা সালমানের মনে আসলো।

নির্দিষ্ট সময়ের পনেরো মিনিট আগেই তর সইতে না পেরে সালমান উঠে ভাষ্কর্যের দিকে নিঃশব্দে এগিয়ে গেল। একটি বিশেষ অ্যাঙ্গেলে তাকাতেই চোখে পড়লো নীল রঙের ব্যাগটি। সালমান চারিদিকে তাকালো। কাউকে দেখা যাচ্ছে না।
ব্যাগটা নিয়ে গাড়ীতে উঠে ব্যাগটা খুলে দেখলো সালমান শত শত পাঁচশো টাকার বান্ডিল। কিছুক্ষণ সে কোন কথা বলতে পারলো না। চুপচাপ বড় বড় চোখে তাকিয়ে রইলো টাকাভর্তি ব্যাগটার দিকে। একসময় নিজের অজান্তেই হাসতে শুরু করলো সে। সেই হাসিটা ক্রমেই অট্টহাসিতে পরিণত হলো। সে ভুলে গেল যে সে একটি অপরাধ করছে। সে ভুলে গেল যে সে একটি নীরব রাস্তায় একা। আর তাই সে টের পেল না যে, স্পেশাল পুলিশ অ্যান্ড সিআইডি স্কোয়াডের শত শত গাড়ি ঘিরে ফেলেছে তাকে, নিঃশব্দে।

[চলবে]
অনুগ্রহ করে পরবর্তী পর্বের জন্য অপেক্ষা করুন।