বৃষ্টি ও একাকীত্বের কথা

বৃষ্টি

সন্ধ্যার পর থেকে বৃষ্টি কিছুটা কমে এসেছে। কিন্তু ঝড়ো হাওয়ার বেগ বেড়েছে। যেন বৃষ্টির কমে যাওয়াটা পুষিয়ে নিতেই বাতাস তার বেগ বাড়িয়ে নিয়েছে।

শহরের ব্যস্ত এই মোড়ের চিত্র অন্যান্য দিনের তুলনায় অনেক ভিন্ন। মোড়ের চা-পানের দোকানটা বন্ধ। রাস্তায় এক-দেড় ইঞ্চি পানি জমে আছে। আশেপাশের টিনশেড বাড়িগুলোর টুয়া থেকে সমানে বৃষ্টির পানি পড়ছে সেই ইঞ্চিখানেক জমে থাকা পানির উপর। খানিকটা ঝর্ণার মতো সেই শব্দের সঙ্গে যোগ হয়েছে টুপটাপ বৃষ্টির শব্দ। আর সেই সঙ্গে বাতাসের শোঁ শোঁ আওয়াজ তো কান পর্যন্তই পৌঁছে যায়।

এসব কিছু শোনা গেলেও দেখা যাচ্ছে না ঠিকভাবে। সন্ধ্যা নেমে যাওয়ার পর থেকে দিনের আলোও প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে কমে এসেছে। এখন কেবল অদ্ভূত এক গাঢ় নীল আবছা আলোয় মোড়ের এই বৃষ্টির ধারা দেখা যাচ্ছে।

শহরের বুকে এমন অবাস্তব ও অবিশ্বাস্য এক মূহুর্তে একলা হেঁটে চলেছে অর্পি। হাঁটার গতি দেখেই বলে দেয়া সম্ভব গভীর কোনো চিন্তায় মগ্ন। এই সময়টায় এখানে এমন দৃশ্য দেখলে সবারই এক মূহুর্ত দাঁড়িয়ে উপভোগ করার কথা। কিন্তু অতিপ্রাকৃতিক এই দৃশ্য উপভোগ করার মতো মন-মানসিকতা যে অর্পির নেই। তাই প্রকৃতির এই অপরূপ চিত্র অর্পির নজরের বাইরেই থেকে গেলো।

অর্পির এই খারাপ আবহাওয়ার দিনে বাসা থেকে বের হওয়ার কোনো প্ল্যানই ছিল না। ছোট বোনের কাছ থেকে সারাদিন টিভির রিমোট লুকিয়ে রেখেছে সন্ধ্যার পরের কিছু নাটক দেখবে বলে। কিন্তু হঠাৎই ওর মন খারাপ হয়ে গেল। অনেকগুলো ভাবনা মাথায় এসে জড়ো হলো। কেন যেন ওর নিজের অস্তিত্বই অসহ্য লাগতে শুরু করলো। এসব থেকে স্বস্তি পাওয়ার আশায়ই বাসায় বান্ধবীর বাসায় যাবে বলে বেরিয়ে এসেছে ও।

কিন্তু ও জানে ওর গন্তব্য কোথাও না। বৃষ্টি না কমলে হয়তো বেরই হওয়া হতো না। বৃষ্টি কমায় এই দমকা হাওয়া ও টুপটাপ বৃষ্টির মাঝে হাঁটতে ভালোই লাগছে। তাই সে হাঁটছে। বৃষ্টির বেগ না থাকায় জমে থাকা বৃষ্টির পানিতে ওর পায়ের আওয়াজ কেমন যেন এক ধরনের ছন্দের সৃষ্টি করেছে। মিনিট দশেক হাঁটার পর এই একলা পথ চলায় অর্পির সঙ্গী হয়ে উঠলো সেই ছন্দময়ী আওয়াজ। এক মূহুর্তের জন্য ও দাঁড়িয়েছিল, আর সঙ্গে সঙ্গেই যেন নীরবতা ওকে ঘিরে ধরেছিল। তাই দম না দিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করেছে সে।

গত ক’দিন ধরেই কেন যেন কোনোকিছুতেই অর্পির আর মন বসছে না। ওর জীবনে না পাওয়ার সংখ্যা খুবই কম। দারুণ এক পরিবারে জন্ম ওর, অসাধারণ সব মানুষ ওর বন্ধু মহলে, কিন্তু তবুও কেন যেন মনে হচ্ছে এর সবই অর্থহীন। হঠাৎই কাছের মানুষগুলোর সব কথাবার্তা, কেয়ার নেয়া, সবকিছু মেকি মনে হচ্ছে। মা সকালে এসে নাস্তা সাধলে মনে হচ্ছে ঢঙ করছে। ওর সবচেয়ে ভালো বন্ধু সিমি ওর জ্বর শুনে সারাদিন এসে পাশে বসে থাকার সঙ্গে সিমির নিজস্ব কোনো স্বার্থ জড়িত বলে মনে হয়েছে। দিনশেষে এই সব ভাবনার জন্য নিজেকেই চরম অপদার্থ বলে নিজের অস্তিত্বের জন্যই রাগ লাগতে শুরু করেছে ওর।

কী হয়েছে ওর? হঠাৎ কেন এতো বদলে যাচ্ছে? ওর আশেপাশের মানুষগুলো তো বদলায়নি। তাদের প্রতি অর্পির দৃষ্টিভঙ্গি কেন এতো বদলালো? বদলাবেই যখন, কেনই বা তা খারাপ দিকে যাবে?

এমনই শত প্রশ্নের মাঝে ডুবে যখন বৃষ্টিজমা গলতে পা ডুবিয়ে হাঁটছে অর্পি, তখন পাশের এক হোটেল থেকে ডাক এলো, “চা খেয়ে যান আপা! এই গরমে চা অনেক ভালো লাগবে। কফিও আছে।”

বয়স্ক লোকটার দিকে একবার কেবল তাকালো অর্পি। আবারও নীরবতা জেঁকে ধরবে এই ভয়ে হাঁটা বন্ধ করলো না। পরমূহুর্তেই যেভাবে মাথা নিচু করে হাঁটছিল, সেভাবে হাঁটতে শুরু করলো। প্রশ্ন জর্জরিত মন মূহুর্তেই আগের অবস্থায় ফিরে গেল। যেন এইমাত্র ঘটা ঘটনা কখনো ঘটেইনি।

অর্পির হেঁটে যাওয়া দেখে হোটেলে লোকটি দ্বিতীয়বার আর ডাকলো না। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তার আত্মসম্মানবোধও কিছুটা বেড়েছে। চা খেতেই তো ডেকেছে। মেয়ের বয়সী মেয়েটার এতে নিজেরও ভালো লাগবে, তারই দু’টো পয়সা আয় হবে। এতে এমন ভাব দেখিয়ে না শোনার ভান করার কি দরকার ছিল!

অথচ অর্পি কোনো ভাব দেখায়নি। সাধারণত ও সবার সঙ্গে খুব মিশুকভাবে কথা বলে। এতে করে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে যে পড়তে হয়নি তা নয়। কিন্তু তবুও ও ভালো ব্যবহার করে সবার সঙ্গে। কিন্তু আজ ওর মন ভীষণ খারাপ। পাড়ার এক হোটেলে থাকা বৃদ্ধের তা বোঝার কথা না। সবাই নিজের অবস্থানে থেকেই আরেকজনকে বিচার করে। আরেকজন কী অবস্থায় আছে, তা ভেবে দেখার প্রয়োজন কেউ বোধ করে না।

অন্ধকার ততক্ষণে জেঁকে ধরেছে অর্পিকে। এই রাস্তায় আর একা হাঁটা নিরাপদ বোধ করলো না। কেন হঠাৎ তার মনে এমন পরিবর্তন এলো, কেন কোনোকিছুই আর তার ভালো লাগছে না, কেনই বা এই খারাপ আবহাওয়ায় বাসা থেকে বেরিয়ে উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটাহাঁটি করলো, এর সব কিছুকে রহস্য রেখেই আবার ফেরার পথ ধরলো সে।

মানুষ কিছু কথা তার সবচেয়ে আপনজনের কাছ থেকেও গোপন রাখে। আবার কিছু কথা আছে, যেগুলো নিজের কাছেও গোপন রাখে, যেগুলোর উত্তর খোঁজাখুজি করে না। থাক না, সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে লাভ কী! মন খারাপের মূহুর্তগুলো শেষে কেবল বৃষ্টিমুখর এক সন্ধ্যার উদ্দেশ্যহীন হাঁটাহাঁটির করে সময় নষ্টের বেশি কিছু হবে না।

আবার কে জানে, হয়তো কারো কারো কাছে সেই উদ্দেশ্যহীন হাঁটাহাঁটিই মন ভালো করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট!!

গল্পঃ পৃথিবীর যত সুখ

‘অ্যাই, শুনছো? অ্যাই! ঘুম ভাঙছে না বুঝি?’
নীলার কানের কাছে প্রায় ফিসফিস করে পাঁচ মিনিট ধরে ডেকে যাচ্ছে অনিক। কিন্তু ভালোবাসা মাখা সেই ডাক যেন কানেই যাচ্ছে না নীলার। শরীরটা ভালো না তার। তাই হঠাৎ করে তাকে ডেকে তুলতে চাচ্ছে না অনিক। মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে আরেকবার ডাকায় আস্তে করে চোখ মেললো নীলা। অনিকের মুখে হাসি ফুটলো। প্রতিদিন সকালে নীলার ঘুম থেকে ওঠার দৃশ্যটা সে কখনোই মিস করে না। কেন যেন এই দৃশ্যের মাঝেও অনেক মানসিক শান্তি খুঁজে পায় সে।

‘আমাকে যে অফিসে যেতে হবে!’ বলল অনিক।
‘ওহ! কয়টা বাজে?’
‘প্রায় সাতটা।’
‘ও।’

মনটা আবার খারাপ হয়ে গেল অনিকের। নীলা কিছুই বললো না। ওর শরীরটা আসলেই ভালো না। অন্যান্য দিন এমন সময় নীলা ব্যস্ত হয়ে দৌড়াদৌড়ি করে অনিকের জন্য নাস্তা রেডি করে। অনিকও যতোটা সম্ভব নীলাকে কাজে সাহায্য করে। কিন্তু আজ নীলার শরীর খারাপ বলে তাকে আর ডাকেনি অনিক। যাবার মূহুর্তে বলে যাওয়ার জন্যই ঘুমটা ভেঙ্গেছে নীলার।

‘আমার আজকে অফিসে যাওয়া একদমই উচিৎ নয়, কিন্তু আজ এমনই কিছু কাজ আছে যে না গিয়েও পারছি না,’ মন খারাপ করে কৈফিয়তের সুরে নীলার কানের কাছে বললো অনিক।
নীলা তার দিকে না তাকিয়েই ক্ষীণ কণ্ঠে বললো, ‘সমস্যা নেই, তুমি যাও।’
তার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো অনিক। আর দুই-এক মিনিট, তারপরই নীলা পুরোপুরি সজাগ হয়ে উঠবে। সেই দুই মিনিট সময় পার করলো সে নীলার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে।

‘শোনো, আমি নাস্তা তৈরি করে গেছি, তুমি ঠিক এক ঘণ্টা পর আটটায় বিছানা থেকে উঠবে। ফ্রিজে ব্রেড রাখা আছে। আমি জেলি দিয়ে রেখেছি, তুমি খেয়ে নিও। আর খাওয়া শেষে পুরো দুই গ্লাস পানি খাবে। পানি খেয়ে সোজা বিছানায় যাবে। কোনো কাজের বাহাদুরি দেখাতে হবে না, বুঝেছো?’ প্রায় যেন আদুরে ধমক দিলো অনিক।

তার এই আচরণের সঙ্গে পরিচিত নীলা। সে একটু হেসে বললো, ‘আচ্ছা ঠিক আছে।’ অনিক বলে চললো, ‘দুপুরের ভাতও আমি রান্না করে রেখেছি। তরকারি কাল রাতেরটাই আছে, আর রান্নার দরকার হবে না। আমি ফোন করে তোমাকে ডেকে দিবো যদি ঘুমিয়ে থাকো। দুপুরে কিন্তু অবশ্যই খেয়ে নিবে সোনা। তোমার শরীরটা ভালো না। না খেলে কিন্তু শরীর আরো খারাপ হবে।’

Continue reading

গল্পঃ My Best Friend Simi (শেষ পর্ব)

My Best friend simi

(পর্ব ১২)

শেষ পর্ব হওয়ায় এই পর্বের দৈর্ঘ্য স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বড়। একবারে শেষ করতে না পারলে অনুগ্রহপূর্বক খণ্ড খণ্ড করে তিনবারে পর্বটি পড়ুন। ধন্যবাদ।

২৮
আজ রাতটা যেন সাইফের আর কাটতেই চায় না।
এমনিতে সাইফ অনেক কষ্টে অন্য কিছুতে মনোযোগ বসিয়ে রাত পার করে দেয়। কোনো রাতেই সে ঘুমায় না, কিংবা ঘুমাতে পারে না। কেবল ভোরের দিকে কিছুটা তন্দ্রামতো আসে। কিন্তু সেই সময়টুকু পর্যন্ত কোনোরকমে কাটিয়ে দেয় সাইফ। কখনো শুয়ে শুয়ে উপরে ঘূর্ণায়মান ফ্যানের দিকে তাকিয়ে থাকে। কখনো লাইট নিভিয়ে অন্ধকারেই চোখ খুলে বসে থাকে। কিন্তু যখন যেভাবেই থাকুক না কেন, ওর মন সব সময় কেবল একটা কথাই ভাবতে থাকে, সিমির কথা।

মাঝে মাঝে সাইফের অবাক লাগে। মনের কি বিরক্ত লাগে না? মানুষের মন আসলে সবচেয়ে রহস্যময় জিনিস। তার আশেপাশে কত ছেলেমেয়ে আছে যারা একের পর এক রিলেশনে গড়ছে আর ভাঙ্গছে। ওদের কাছে এটা যেন সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের মতো ঘটনা। সাইফ কেন সে রকম হতে পারলো না কে জানে। হয়তো কাউকে সত্যি সত্যি ভালোবাসলে এমন হওয়া যায় না। হয়তো এই ছেলেমেয়েগুলোও যেদিন কাউকে মন থেকে ভালোবাসবে, তখন সত্যিই সিরিয়াস হয়ে যাবে। তখন আর সম্পর্ক ভেঙ্গে গেলে এতো কেয়ারলেস থাকতে পারবে না।

মাঝে মাঝে সাইফের নিজেকে মনে হয় মানসিক রোগী। এটা ভাবতে তার খারাপ লাগে না। সে আসলে বিশ্বাসই করে যে সে মানসিক রোগী। নাহলে যে চলে গেছে তার স্মৃতি আঁকড়ে রাখবে কেন? তার চেয়ে বড় কথা, তার স্মৃতি আঁকড়ে থাকার মধ্যেই মানসিক আনন্দ খুঁজে পাবে কেন?

সাইফ হয়তো কোনোদিন সিমিকে বোঝাতেই পারেনি সিমি তার কাছে কতোটা মূল্যবান, কতোটা বেশি আপন। মানুষের সব রকম প্রতিক্রিয়া সাধারণত আপন মানুষের উপরই পড়ে এই সত্যটা হয়তো সিমি বুঝতে পারেনি বা মেনে নিতে পারেনি। সাইফের ব্যক্তিগত যেসব কষ্ট রয়েছে, সেসব কষ্ট সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেলেই যে ও বেশ রূঢ় ব্যবহার করে ফেলত, আর সেটা যে তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে ছিল, তা যেন সৃষ্টিকর্তা জেনেও ইচ্ছে করে সিমির কাছে গোপন করে গেছেন। সিমির সঙ্গে বলা প্রতিটি রুড কথার জন্য সাইফ নিজেকে কতোবার ধিক্কার দিয়েছে তা বুঝি সৃষ্টিকর্তা একাই উপভোগ করেছেন। কে জানে, হয়তো প্রথমদিন সিমির হাত ধরে সাইফ মনে মনে যে স্রষ্টার কাছে বলেছিল যে, এই সিমিকে সবসময় সুখী রাখাই হবে তার জীবনের অন্যতম একটা উদ্দেশ্য, তখন বুঝি সৃষ্টিকর্তা অট্টহাসি দিয়েছিলেন। তিনি নিশ্চয়ই হাসির ফাঁকে আপনমনে বলেছেন, ‘রাখিস সুখী! দেখবো কতোটা সুখী রাখতে পারিস! আগে তো নিজে সুখী থাকবি, নাকি!’

Continue reading

গল্পঃ My Best Friend Simi (পর্ব ১২)

My Best friend simi

(পর্ব ১১)

২৫
আজও কলেজ প্রায় ফাঁকা। সকাল থেকে এক নাগাড়ে বৃষ্টি হওয়ায় দূর-দূরান্ত থেকে অনেকেই আসতে পারেনি। সেই সুযোগে যাদের বাসা কাছেই তারাও ফাঁকি দিতে মিস করেনি। কিন্তু সাইফ আজ ঠিকই এসেছে। সে অনেক ভালো ছাত্র তাই বলে নয়, সে যখন বেরিয়েছে তখন বৃষ্টি থেমেছিল। তাই ইচ্ছে থাকলেও কলেজে যাওয়া বাদ দিতে পারেনি।

কলেজে এসে দেখে তার ক্লাসরুমে মাত্র দশজন আছে। তাদের মধ্যে অনিকও ছিল। অনিক ছেলেটা বেশ প্রাণচঞ্চল। শারমিন নামের একটা মেয়ের সঙ্গে ওর রিলেশন আছে আজ প্রায় তিন বছরেরও বেশি হয়েছে। এতো দীর্ঘ সময় রিলেশন ধরে রাখা কঠিন। ওদের মাঝে অনেকবার ব্রেকআপ হওয়ার কথা শুনেছে সাইফ। কিন্তু প্রতিবারই সব ঠিক করে নেয় অনিক। ব্যক্তিগতভাবে অনিক খুব ফাস্ট। কথা দিয়ে মানুষকে ভোলাতে তার এক মিনিট সময়ও লাগে না। বিশেষ করে মার্কেটিং-এর কাজে ওকে লাগালে ও বেশ ভালো করতে পারবে বলে সাইফের বিশ্বাস। এসব মানুষই হয়তো রিলেশন টিকিয়ে রাখতে পারে। রিলেশন টিকিয়ে রাখতে কেবল ভালোবাসা আর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশই যথেষ্ট না। ভুলিয়ে-ভালিয়েও রাখতে হয়, যেটাকে শুদ্ধ বাংলায় পটানো বলে!

Continue reading

গল্পঃ My Best Friend Simi (পর্ব ১১)

My Best friend simi

(পর্ব ১০)

২৩
সকাল থেকে ঝড়ো হাওয়াসহ তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে। তবে আজ সাইফের কলেজ না যাওয়ার ছুতো বের করার সুযোগ নেই। কেননা, আজ শুক্রবার। বৃষ্টি হোক বা রোদ উঠুক, আজ সে বাসায়ই থাকবে। সকাল থেকে বৃষ্টি হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই সে শোয়া থেকে উঠেনি। প্রতিদিনের মতোই সেদিনও তেমন একটা ঘুম হয়নি রাতে। তাই সকালে একটু ঘুমানোর চেষ্টা করলো সাইফ। কিন্তু তার ঘুম আসলো না।

সিনথিয়ার কথা ভাবলো সাইফ। সিনথিয়া তাকে প্রোপোজ করেছিল। সে বেশ অবাক হয়েছিল সেদিন। এভাবে তাকে ভালোবেসে বসবে সিনথিয়া, সাইফ সেটা ভাবেনি। সিনথিয়াকে মুখের উপর না বলে দেয়ার কথাও মনে করলো সে। হয়তো তাকে আরেকটু বুঝিয়ে বলা উচিৎ ছিল। মেয়েটা নিশ্চয়ই অনেক কষ্ট পেয়েছে। কিন্তু তা নিয়ে আর বেশি মন খারাপ করলো না সাইফ। সিনথিয়া এখন ওর জীবন সম্পর্কে যথেষ্টই জানে। এরপরও যদি পুরনো ভালোবাসা ধরে রাখে, তাহলে সাইফের এখানে কী-ই বা করার আছে?

সিমির কথা মনে পড়লো সাইফের। এ অবশ্য নতুন কিছু নয়। প্রতিদিন সারাক্ষণই সিমির কথা মনে পড়ে ওর। সিমি এই মুহুর্তে কী করছে, কেমন আছে জানার জন্য সাইফের মন খুব ছটফট করে। এক রকম দাঁত চেপে রেখে নিজের কষ্টটা নিজেই চাপা দিয়ে রাখে সে। যতোই চেষ্টা করে না কেন অন্য কিছু ভাবার, তার মনে কেবল একটাই জিনিস ঘুরেফিরে আসে, সিমির স্মৃতি।

আজ সিমির হাত ধরে হাঁটছে সাইফ। অনেকদিন পর সিমির হাত ধরেছে ও। সিমির হাত ধরায় যে কতো আনন্দ তা কোনোদিনই সাইফের অনুভূতি এড়িয়ে যায়নি। কিন্তু আজ যেন এই আনন্দ অসীম হয়ে উঠেছে। সিমি ইতস্তত ভঙ্গিতে হাঁটছে ওর সঙ্গে। সাইফ তাকে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করছে, তারা দু’জন আবার আগের মতো হয়ে উঠতে পারে।
‘না সাইফ,’ সিমি বলল, ‘আমার মনে হয় না।’
সাইফ তাকে আশ্বস্ত করলো, ‘তুমি কষ্ট পেয়েছো, এ জন্য তোমার মন মানতে চায় না সিমি। বিশ্বাস করো, একটু চেষ্টায়ই আমরা আগের মতো হতে পারবো।’
সিমি চুপ করে রইল। সাইফ বলল, ‘মানুষ হয়তো নিজেকে বদলাতে পারে না। আমাদের তো কারোরই কাউকে বদলানোর দরকার নেই। মাঝখানে এতোদিন আমাদের মাঝে যে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে কেবল সেটা ঠিক হলেই আমরা আবার ঠিক হয়ে যাবো। আর ভুল বোঝাবুঝিটা তো আর এখন নেই, তাই না?’

সিমি তবুও চুপ করে রইল। তার মনে হয়তো ভয় হচ্ছে আবারও কষ্ট পাওয়ার। কিন্তু সাইফের মনে হচ্ছে সিমি ওর এতো অনুরোধ কখনোই ফেলতে পারবে না। সিমি ওকে ভালোবাসে। সাইফের এই দৃঢ় বিশ্বাস থেকেই সে সিমিকে বারবার কাছে টানতে চাইছে। সে সিমিকে অনেক অনেক ভালোবাসে। সিমিকে ছাড়া ও অনেক বেশি একা হয়ে যায়। কিছুতেই তাকে ছাড়া ভালো থাকতে পারবে না সাইফ।

সিমিকে দেখে সাইফের মনে হচ্ছে সিমি আরেকবার কাছে আসতে চাইছে। সাইফ সিমির কাঁধে হালকা করে একটা চুমু খেলো। সিমির শরীরটা যেন কেঁপে উঠলো। সাইফ মনে মনে হাসলো। সিমি সেই প্রথমদিন থেকেই সাইফের প্রতিটা স্পর্শ অনেক বেশি ফিল করে। এমনকি শেষবারও সাইফ ওর কাঁধে আদর করার পর সিমি কেঁপে উঠেছিল। সাইফের ব্যাপারটা খুবই সুইট মনে হয়। আজ এতোগুলো দিন পর সিমির সেই কেঁপে উঠা দেখে সাইফের মনে হলো যেন শত-সহস্র বছর পর আকাশে বিশাল চাঁদ উঠেছে। সাইফ কিছু বলল না। এ যে শুধুই অনুভব করার জন্য।

Continue reading

গল্পঃ My Best Friend Simi (পর্ব ১০)

My Best friend simi

(পর্ব ৯)

২১
কলেজ ছুটি হয়ে গেছে। নির্ধারিত সময়ের ঘণ্টাখানেক আগেই ছুটি হয়ে যাওয়ায় অনেকেই কলেজের মাঠে ঘোরাফেরা করছে। উপস্থিতিও কম, স্যাররাও কিছু বলছেন না তাই বেশ চুটিয়ে মজা করছে সবাই। আর একটু দূরে কলেজ বিল্ডিং-এর বারান্দায় রাখা বেঞ্চে বসে তাদের মজা করার দিকে তাকিয়ে আছে সাইফ। পাশে তার সিনথিয়া। সিনথিয়া ঠিক করেছে এখনই বাসায় যাবে না। এই ছেলেগুলো যতক্ষণ আছে ততক্ষণ থাকবে। সাইফের কথা শুনবে।

আকাশ তখন মেঘাচ্ছন্ন। বৃষ্টি আবারো নামবে নামবে করছে। সিনথিয়া সাইফকে বলল, ‘আবহাওয়াটা কেমন না? আনপ্রেডিক্টেবল।’
‘হুম,’ আনমনে জবাব দিলো সাইফ। ‘এমন আবহাওয়া অনেক পুরনো স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়।’
‘কী রকম? সিমির কথা?’
‘হ্যাঁ। ও আমার জীবনে তুলনামূলকভাবে খুব ছোট্ট একটা সময়ের জন্য ছিল। কিন্তু এই সময়েই সে আমার মধ্যে তার একটা রাজ্য তৈরি করে দিয়ে গেছে। সেই রাজ্যে নেই এমন প্রায় কিছুই নেই।’
‘তাই? কী রকম বলো তো শুনি,’ সিনথিয়ার কণ্ঠে আগ্রহ।
‘এই যেমন ধরো আবহাওয়ার কথা। এমন কোনো আবহাওয়া নেই যখন আমি ওর সঙ্গে ছিলাম না। এই যে এখন যেই আবহাওয়া, এই আবহাওয়ায় আমি ওর সঙ্গে ঘুরেছি। খুব বেশি সময় না, তবে ঘুরেছি। বিভিন্ন জায়গায় বাসের জন্য দাঁড়িয়ে থেকেছি। ওর বৃষ্টিতে ভেজা খুবই পছন্দ ছিল। কিন্তু ঠাণ্ডা লেগে যাবে এই ভয়ে আমি আমার ব্যাগ ওর মাথার উপরে ধরতাম। সঙ্গে সঙ্গে ওর মনটা খারাপ হয়ে যেত। ব্যাগটা সরালেই ফিরে আসতো দীপ্তিময় হাসি। আমি দেখে খুব মজা পেতাম। ও রীতিমতো কাকুতি-মিনতি করতো ভেজার জন্য। অবশ্য তেমন কাকভেজা আমরা মাত্র একবার ভিজেছি।’

Continue reading

গল্পঃ My Best Friend Simi (পর্ব ৯)

My Best friend simi

(পর্ব ৮)

১৯
পরদিন যথারীতি তুমুল বৃষ্টি। ভোর থেকেই বৃষ্টি শুরু হলো। সেই বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ নেই। বাসায় বসে সাইফ ভাবছে আর আধঘণ্টা বৃষ্টি হলে কলেজেই যাবে না। কিন্তু যেই সে ভাবলো, সঙ্গে সঙ্গেই যেন বৃষ্টি কমে এলো। তাই সাইফের কলেজে না যাওয়া আর হলো না। আবার বৃষ্টি নামার আগেই কলেজে পৌঁছানোর জন্য তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে পড়লো।

কলেজে আজ ছাত্র-ছাত্রী প্রায় নেই বললেই চলে। সবাই বৃষ্টিকে অজুহাত বানিয়ে ক্লাস ফাঁকি দিয়েছে। অবশ্য এমন দিনগুলোতে ক্লাস করে অভ্যাস আছে সাইফের। তাই ওর মন খারাপ হলো না। বরং অবাক হলো যখন দেখলো ক্লাসরুমে সাত-আটজন ছেলে ছাড়াও মেয়েদের মধ্যে সিনথিয়া বসে আছে। এই বৃষ্টির দিনে সিনথিয়া কলেজে আসবে ভাবতেই পারেনি সাইফ। অবশ্য ওর আসতে কি! নিজেদের গাড়ি আছে। গ্যারেজ থেকে গাড়িতে উঠবে, কলেজের সামনে এসে নামবে। বিত্তশালীদের অনেক সমস্যাই কোনো সমস্যা না।

Continue reading

গল্পঃ My Best Friend Simi (পর্ব ৮)

My Best friend simi

(পর্ব ৭)

১৭
দুপুরের পর আবার বৃষ্টি নেমেছে। দুপুরের দিকে বৃষ্টি যা-ই একটু থেমেছিল, সেই ক্ষতিটা পুষিয়ে নিতেই যেন আকাশ ভেঙ্গে ঢল নেমেছে। একটানা এতো লম্বা সময় এভাবে বৃষ্টি হতে খুব কমই দেখা যায়। সাইফ তার জানালা দিয়ে বৃষ্টির ফোঁটার মাটিতে পড়া দেখছে। পানি জমে আছে তার জানালার সামনে। সেই জমে থাকা পানির উপর অনবরত বৃষ্টির ধারা পড়ছে। সব মিলিয়ে যেন ছোট্ট একটা লেক তৈরি হয়েছে ওর জানালার সামনেই।

অন্য কোনো সময় হলে হয়তো দৃশ্যটা খুব উপভোগ করতে পারতো সাইফ। কিন্তু এখন আর সে কিছুই উপভোগ করে না। উপভোগ করতে হলেও অনুভূতি থাকতে হয়। আজ তার মধ্য থেকে অনুভূতিগুলো পালিয়ে গেছে। সে এখন চাইলেও কিছু অনুভব করতে পারে না। কেবল একটাই তার অনুভ’তি রয়েছে, তা হলো সিমির অভাব।

তুমুল বৃষ্টির শব্দে কখন থেকে সাইফের ফোন বাজছে সে খেয়ালও করেনি। যখন দেখলো ততক্ষণে দশবার মিসকল হয়ে গেছে। সিনথিয়া ফোন করেছিল। সাইফ আবার ফোন করবে ভাবছে এমন সময় সিনথিয়া আবার ফোন করলো। ফোন ধরলো সাইফ।

Continue reading

গল্পঃ My Best Friend Simi (পর্ব ৭)

My Best friend simi

(পর্ব ৬)

১৫
রেস্টুরেন্টে পৌঁছে দেখলো মাত্র খুলেছে রেস্টুরেন্টটা। এখনো ভেতরটা গোছগাছ করাও হয়নি। রেস্টুরেন্টটা চালাচ্ছে অল্পবয়সী এক ছেলে। সিনথিয়াকে দেখেই সে সিনথিয়ার খোঁজ খবর নিলো। কলেজ পালিয়ে এসেছে সেটা দেখেই বুঝেছে তাই এ নিয়ে আর কিছু জিজ্ঞেস করলো না। ওদেরকে বসতে বলল। খাবার দিতে আরও কমপক্ষে এক ঘণ্টা লাগবে বলে জানালো। সিনথিয়াও জানিয়ে দিলো ওদের সময় দুপুর পর্যন্ত অফুরন্ত!

সিনথিয়া তার ব্যাগ পাশের চেয়ারে রেখে আরাম করে বসলো। বসেই সাইফকে তাগাদা দিতে শুরু করলো সিমির কথা শুরু করতে। সাইফের খানিকটা অবাকই লাগলো। অন্য কেউ হলে অবাক হতো না। ভালোবাসার সত্যি গল্প শোনার আগ্রহ অনেকেরই থাকে। কিন্তু সিনথিয়ার ক্ষেত্রে তো ব্যাপারটা ভিন্ন। তবুও সে বলতে শুরু করলো।

‘সিমি একদিন জানালো ও আর ওর বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে রিলেশন রাখবে না। ব্যাপারটা শুনে আমি খুব একটা অবাক হইনি। কারণ মাত্র ২ মাসে আমি ওকে বহুবার এমন একশ’ ভাগ সিরিয়াস ডিসিশন নিতে দেখেছি। প্রতিবারই আমার মনে হয়েছে এবার ও আর সুযোগ দেবে না। কারণ, প্রতিবারই ওর এমন সিদ্ধান্ত নেয়ার পেছনে কারণ থাকে। সেবার জানলাম ওর বয়ফ্রেন্ড তার একটা ফ্রেন্ডকে দিয়ে সিমিকে কথা শুনিয়েছে। অর্থাৎ, তৃতীয়পক্ষের একটা মানুষকে হর-হামেশাই ওর বয়ফ্রেন্ড ওদের মাঝে ইন্টারফেয়ার করতে দিতো। কেবল তাই না, সে সিমিকে রীতিমতো বকাঝকাও করতো। এসব শুনে আমার অবাকই লাগতো, রাগও হতো। কিন্তু কখনো জোর দিয়ে বলতাম না যে রিলেশন ব্রেক আপ করে ফেল। কারণ, আমিও একটা ছেলে। স্বাভাবিকভাবেই একটা মেয়েকে এই বিষয়ে জোর করলে ব্যাপারটা অন্য রূপ নেয়।’

সিনথিয়া মাথা দোলালো।

‘প্রায় দশ-বারোবার সুযোগ দেয়ার পর সেবারই ছিল সিমির শেষ সিদ্ধান্ত। ও ঠিক করলো, আর যত যাই হোক, ও কখনোই ওর বয়ফ্রেন্ডের কাছে ফিরে যাবে না। আমি প্রথম দিকে কিছু বলিনি। পরে অবশ্য কয়েকবার ওকে বলেছি ওর বয়ফ্রেন্ডের বিষয়টা ভেবে দেখতে। কারণ, ব্যক্তিগতভাবে আমি যে কোনো রিলেশন ভেঙ্গে যাওয়া দেখতে পছন্দ করি না। এমনকি চিনি না জানি না এমন মানুষের ক্ষেত্রেও সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়ার কথা শুনলে আমার মন খারাপ হয়ে যায়। কারণ, একটা সম্পর্কে শুধু দু’টো মানুষ নয়, তাদের হাজার হাজার স্বপ্ন লুকিয়ে থাকে। এই একটা জিনিস যে কোনো কঠিন মনের মানুষকেও শিশুর মতো অনুভূতি দিতে পারে। তাই আমি কয়েকবার ওকে বলেছিলাম আর একবার হয়তো ভেবে দেখতে পারে। কিন্তু ও তার সিদ্ধান্তে অটল ছিল। আমারও ওর এতো কষ্ট পাওয়া দেখতে ভালো লাগতো না। তাই আমিও তেমন কিছু বললাম না। ওর জীবন, সিদ্ধান্তও ওর।’

Continue reading