মোজিলা সামিট ২০১৩: ওপেন ইন্টারনেটের লক্ষ্যে মোজিলার অবস্থান ও ভবিষ্যতের ফায়ারফক্স (২য় দিন)

এই পোস্টটি তিনটি ধারাবাহিক পোস্টের দ্বিতীয় পর্ব। যুক্তরাষ্ট্রের সান্তা ক্লারায় চলমান মোজিলা সামিট ২০১৩ থেকে বিভিন্ন হাইলাইটগুলো নিয়ে আজকের এই পোস্ট। সিরিজের প্রথম পোস্টটি দেখুন এখানে: মোজিলা সামিট ২০১৩: মোজিলা ও ফায়ারফক্স ওএস-এর ভবিষ্যত (১ম দিন)

মজিলা ম্যাগাজিন

মোজিলা সামিট ২০১৩-এর দ্বিতীয় দিনের শুরুর প্রেজেন্টেশনগুলো ছিল মোজিলা কীভাবে একটি উন্মুক্ত ইন্টারনেটের লক্ষ্যে এগোচ্ছে এবং ফায়ারফক্স ব্রাউজার ও ফায়ারফক্স ওএস এর জন্য ভবিষ্যতে কী অপেক্ষা করছে। যেমনটা উপরের ছবিতে দেখতে পাচ্ছেন, মোজিলার চোখে এই বিষয়গুলো ওপেন ইন্টারনেটের সাইন বা চিহ্ন। তবে ওপেন ইন্টারনেটের আগে মোজিলা দেখছে আসলে কত শতাংশ মানুষ ইন্টারনেটের সঙ্গে পরিচিত বা ইন্টারনেটকে তাদের জীবনে উন্নয়ন আনার জন্য কাজ করছে।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে, পুরো জনসংখ্যার মাত্র এক তৃতীয়াংশ মানুষ ওয়েবের সঙ্গে পরিচিত এবং সক্রিয়ভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করে থাকেন। যারা ব্যবহার করেন তাদের মধ্যে তৃতীয় বিশ্বের ব্যবহারকারী মাত্র ২৫ শতাংশের কাছাকাছি যা সাম্প্রতিক সময়ে বেড়ে চলছে। এখনও ইন্টারনেটে প্রবেশ না করা জনসংখ্যাকে ইন্টারনেটের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে এবং ইন্টারনেটে প্রবেশাধিকার দিতে মোজিলার অন্যতম একটি মাধ্যম হচ্ছে ফায়ারফক্স ওএস।

সারাবিশ্বে মোবাইল ডিভাইস থেকে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রতিনিয়তই বেড়ে চলেছে। ইতোমধ্যেই মোবাইল ডিভাইস থেকে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে পিসি বা ডেস্কটপ কম্পিউটার ব্যবহারকারীর সংখ্যাকে। আর ভবিষ্যতেও এই ধারা অব্যাহত থাকবে তা ধারণাই করা যায়।

তবে মোবাইল মার্কেটে এই মুহূর্তে রাজত্ব করে চলেছে অ্যান্ড্রয়েড ও আইওএস। তাদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মোবাইল মার্কেট শেয়ার জয় করা মোজিলার লক্ষ্য বলে মনে হলেও, আসলে তা নয়। মোজিলা তাদের ফায়ারফক্স ওএস-এর মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মানুষকে ইন্টারনেটের সঙ্গে পরিচয় করাতে চাচ্ছে এবং ওপেন ওয়েব অ্যাপ্লিকেশনগুলো ফায়ারফক্স ওএস-এর পাশাপাশি উইন্ডোজ, ম্যাক, লিনাক্স ও অ্যান্ড্রয়েডের জন্যও উপযোগী করে তুলছে। (এ বিষয়ে ফায়ারফক্স ফর অ্যান্ড্রয়েড-এ বিস্তারিত বলা হয়েছে।)

আরও বেশি সংখ্যাক মানুষকে ইন্টারনেটের জগতে প্রবেশ করানোর পাশাপাশি মোজিলার লক্ষ্য রয়েছে ইন্টারনেটে সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এক জরিপে দেখা গেছে, মানুষের “বিশ্বস্ত” ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে সবার নিচে অর্থাৎ ২৫ নম্বরে রয়েছে ইন্টারনেট ও সোশাল মিডিয়া। মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করলেও ইন্টারনেট কোম্পানিগুলোকে মানুষ খুব একটা বিশ্বাস করে না, যার যথেষ্টই কারণ রয়েছে।

তবে খুশির খবর হচ্ছে, মোজিলা শুরু থেকেই ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে কাজ করছে। “ডু নট ট্র্যাক”-এর মতো প্রযুক্তিগুলো সম্ভব হচ্ছে মোজিলার কারণে। এর ফলে ইন্টারনেট ও সোশাল মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রি ট্রাস্টেড লিস্টে সবার শেষে থাকলেও এই ইন্ডাস্ট্রিতে সবচেয়ে বিশ্বস্ত হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছে।

সামিটের দ্বিতীয় দিনের প্রেজেন্টেশনে মোজিলা জানায় তারা নিজেদের কোথায় দেখতে চায় এবং সেখান থেকে তাদের বর্তমান অবস্থানের পার্থক্য কতটুকু। নিজেও দেখে নিন, মোজিলা ঠিক তার পথেই এগোচ্ছে। যেমনটা গতকালই বলা হয়েছে, মোজিলার সামনে এগিয়ে চলার স্পষ্ট পরিকল্পনা ও স্ট্র্যাটেজি রয়েছে এবং তারা এতে সফল হবে বলেই আশ্বস্ত হয়েছেন মোজিলা সামিটের শত শত মোজিলিয়ান।

ফায়ারফক্স

এবারে আসা যাক ফায়ারফক্স ওয়েব ব্রাউজার নিয়ে। প্রতিনিয়তই নতুন নতুন বৈশিষ্ট্য যোগ হতে থাকা ফায়ারফক্স ব্রাউজারে একটি বিষয়ে অনেকদিন কোনো পরিবর্তন আসছে না, আর তা হলো এর ইউজার ইন্টারফেস। মোজিলা আগেই বলেছে, ভবিষ্যতে বিভিন্ন আকারের স্ক্রিনে ব্যবহারকারীদের একই ইন্টারফেস দেয়া বা রেসপন্সিভ ইউজার ইন্টারফেস একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু ব্রাউজার নিজেই তো এতোদিন সব স্ক্রিনে একরকম দেখাতো না! এখানে পরিবর্তন এনে ডেস্কটপ, ল্যাপটপ, মোবাইল ও ট্যাবলেট — সব ডিভাইসে একই ডিজাইন আনার লক্ষ্যেই ফায়ারফক্স তাদের ডিজাইন ভ্যালু অনুসরণ করে ডিজাইন করেছে নতুন ইউআই – Australis.

নতুন ডিজাইনের এই ফায়ারফক্স দেখতে বর্তমান ফায়ারফক্সের চেয়ে অনেক আকর্ষণীয়, যে কোনো ডিভাইসের জন্য উপযোগী এবং এর ইউজার ইন্টারফেস ব্যবহারকারীদের জন্য আরও সহজ করে তোলা হচ্ছে। তবে কবে নাগাদ নতুন এই ইন্টারফেসে ফায়ারফক্স রিলিজ হবে সে সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি।

ফায়ারফক্স ওএস অ্যাপ মেকার

ফায়ারফক্স ওএস-এর জন্য অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করা এখন আগের চেয়েও অনেক সোজা। ফায়ারফক্স ওএস সিমুলেটরে কিংবা আসল ফায়ারফক্স ওএস ডিভাইসে রিয়েল টাইম আপডেটের মাধ্যমে অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপ করা সম্ভব। ফায়ারফক্স ওএস-চালিত ফোনে ডিবাগ মোডে অ্যাপ্লিকেশনটি রান করার পর তাতে ইনপুট দিলে তা সরাসরি অ্যাপ মেকারে চলে যায়। অর্থাৎ, ফায়ারফক্স ওএস সিমুলেটর কিংবা ডিভাইস যেটাই থাকুক, অ্যাপ্লিকেশন কোডিং এখন আগের চেয়ে অনেক অনেক দ্রুত ও সহজ।

Shumway

কেমন হবে, যদি ওয়েবের সব ফ্ল্যাশ কন্টেন্ট এইচটিএমএল৫ দ্বারাই দেখা যেত? Shumway-তেমনই একটি প্রযুক্তি যা এখনও ডেভেলপমেন্টের পর্যায়ে রয়েছে। এর মাধ্যমে ফ্ল্যাশ প্লেয়ার ছাড়াই ব্রাউজারে ফ্ল্যাশ গেমস বা কন্টেন্ট রান করা সম্ভব হচ্ছে। এটি ইতোমধ্যেই ফায়ারফক্স নাইটলিতে চলে এসেছে। ফ্ল্যাশ প্লেয়ার ছাড়াই ফ্ল্যাশ কন্টেন্ট রেন্ডার করা সম্ভব হয়েছে এইচটিএমএল৫ ও জাভাস্ক্রিপ্টের কল্যাণে।

মোজিলা সামিট ২০১৩-এর দ্বিতীয় দিন এই নতুন প্রযুক্তির ডেমো দেখানো হয়।

ফায়ারফক্স ফর অ্যান্ড্রয়েড

অ্যান্ড্রয়েড ফায়ারফক্সের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। মোবাইল মার্কেটে এক নম্বর অবস্থানে থাকা এই প্ল্যাটফর্মকে ধরে ফায়ারফক্স গড়ে তুলতে পারে তাদের নিজস্ব ইকোসিস্টেম। বর্তমানে ফায়ারফক্স ব্রাউজার ব্যবহার করে অ্যান্ড্রয়েডে ফায়ারফক্স মার্কেটপ্লেস থেকে অ্যাপ্লিকেশন ডাউনলোড করা যায়। মোজিলার লক্ষ্য হচ্ছে, ভবিষ্যতে ফায়ারফক্স মার্কেটপ্লেস থেকে নেটিভ অ্যাপ্লিকেশন হিসেবে অ্যান্ড্রয়েড, উইন্ডোজ ও ম্যাকিনটশে অ্যাপ্লিকেশন ইন্সটলের ব্যবস্থা করা। এটি ইতোমধ্যেই সম্ভব হয়েছে যার ডেমো দেখানো হয়েছে সামিটে। কিন্তু এটি এখনও কেবল মোজিলা নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছে।

ফায়ারফক্স ফর অ্যান্ড্রয়েডে শিগগিরই আসছে গেস্ট মোড নামে নতুন একটি সুবিধা। এটি অনেকটা প্রাইভেট ব্রাউজিং-এর মতোই; কিন্তু এর বিশেষত্ব হলো এটি একেবারেই ভিন্ন একটি প্রোফাইলে কাজ করবে। প্রাইভেট ব্রাউজিং-এ আপনি কোন কোন সাইট দেখছেন বা লগইন করছেন সেগুলো ঢেকে রাখতে পারলেও ইতোমধ্যেই কোন কোন সাইট দেখা হয়েছে, বুকমার্ক করা হয়েছে ইত্যাদি কিন্তু লুকানো যায় না। গেস্ট মোডের বিশেষত্ব এটাই হবে যে, এখানে একেবারেই নতুনের মতো করে লঞ্চ হবে ফায়ারফক্স। ফলে আপনি কোনো বন্ধুকে ব্রাউজ করার জন্য ডিভাইস দিলে নিশ্চিত থাকতে পারবেন যে তিনি আপনার ব্রাউজারে লগইন করা কোনো সাইটে ঢুকতে পারবেন না বা আপনি কী ব্রাউজ করেন তা জানতে পারবেন না।

ফায়ারফক্স ওএস-এর জন্য অ্যাপ ডেভেলপ করার পর তা যেন অ্যান্ড্রয়েডেও চলে এ জন্য ফায়ারফক্সের ইঞ্জিন গেকো আপনি আপনার অ্যাপ্লিকেশনে যোগ করে দিতে পারবেন। “গেকোভিউ” নামের এই সুবিধাটি নিলে অবশ্য আপনার অ্যাপ্লিকেশনের আকার এক লাফে ১৬ মেগাবাইট বেড়ে যাবে, কিন্তু ওপেন ওয়েব অ্যাপ অ্যান্ড্রয়েডে চালানোর জন্য ব্যবহারকারীকে নিজে থেকে ফায়ারফক্স ইন্সটল করতে হবে অথবা অ্যাপ ডেভেলপারকে “গেকোভিউ”-এর সাহায্য নিতে হবে।

মোজিলার মার্ক ফিনকল এ ব্যাপারে জানিয়েছেন, তারা “গেকো রানটাইম ভার্সন” জাতীয় কিছু একটা তৈরির জন্য কাজ করছেন যেটি ব্যবহারকারীদের কেবল একবার ইন্সটল করার মাধ্যমে সব ওয়েব অ্যাপ চালানোর ব্যবস্থা করে তুলবে।

এছাড়াও ফায়ারফক্স মার্কেটপ্লেসে অ্যাপ্লিকেশন সাবমিট করার পর ডেভেলপারদের অ্যান্ড্রয়েডের জন্য এপিকে জেনারেট করার সুবিধা দেয়া হতে পারে বলেও জানিয়েছেন মার্ক ফিনকল।

এক ব্রাউজার ব্যবহার করে কন্ট্রিবিউট করা

ফায়ারফক্স ব্রাউজার ব্যবহার করেই পুরো ওয়েবের বিভিন্ন কাজ করা সম্ভব হচ্ছে। এইচটিএমএল৫-এর কল্যাণে ওয়েব অ্যাপ্লিকেশনের সংখ্যাও বাড়ছে যার ফলে পুরো ইন্টারনেটই একটি ব্রাউজারে চলে আসছে। এছাড়াও মোজিলার বিভিন্ন প্রজেক্টের লোকালাইজেশন, বাগ নিয়ে আলোচনা, ইথারপ্যাড ইত্যাদি সবই ব্রাউজার-ভিত্তিক। তাই এই ব্রাউজারকে কীভাবে আরও উন্নত করা যায় তা নিয়ে ছিল একটি দুই ঘণ্টার সেশন।

তবে এই সেশনে মূলত ডেভেলপমেন্ট-কেন্দ্রিক আলোচনা হওয়ায় খুব একটা বোঝা সম্ভব হয়নি। 😛

দি গ্রেট আমেরিকা

বিভিন্ন সেশন শেষে মোজিলা এবারের সামিটে অংশগ্রহণকারী যারা সান্তা ক্লারায় এসেছেন, তাদের জন্য রেখেছে “গ্রেট আমেরিকা” নামের একটি পার্কে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ। তবে পার্কের অভিজ্ঞতা নিয়ে পরবর্তীতে বিস্তারিত পোস্ট করা হবে।

মোজিলা সামিট ২০১৩

মোজিলা বাংলাদেশ

মোজিলা সামিট ২০১৩

মোজিলা বাংলাদেশ

আরও ছবি

ফেসবুকঃ মোজিলা সামিট প্রথম দিন :: মোজিলা সামিট দ্বিতীয় দিন

ফ্লিকআরঃ মোজিলা সামিট ২০১৩

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s