গল্পঃ My Best Friend Simi (পর্ব ৫)

My Best friend simi

(চতুর্থ পর্ব)

১১
বিকেল চারটার দিকে সাইফ তার রুমে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। তার রুম থেকে আকাশ খুব একটা ভালো দেখা যায় না। কিন্তু অল্পখানি আকাশ দেখা যায়। আগে সাইফ আকাশের দিকে তাকাতো বৃষ্টি আসবে কি না তা বোঝার জন্য। আর এখন সে তার দিনের বেশিরভাগ সময়ই আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। যেন তার হারানো অতীতের সাক্ষী হয়ে আছে আকাশ।

চারটার কিছু পরে সাইফের ফোন বেজে উঠলো। অসময়ে কে ফোন করলো ভেবে অবাক হলো। ওর কাছে এখন ফোন আসা মানেই অসময়। রিসিভ করে বুঝলো সিনথিয়া ফোন করেছে। ও ভুলেই গিয়েছিল আজ সিনথিয়া ফোন করবে বলেছিল।

‘হাই সাইফ, কী করছো?’
‘কিছু না বসে আছি।’
‘কোথায় বসে আছো?’
‘আমার রুমে।’
‘হুম। দুপুরে কী খেলে?’
‘তেমন কিছু না।’
‘হুম।’ সিনথিয়া বুঝলো সাইফ দুপুরে কিছু খায়নি। কিন্তু এ নিয়ে সে আর তর্কে গেলো না। ও এখন অনেকটা স্বেচ্ছাচারী হয়ে গেছে। নিজের ইচ্ছেয় চলে।
‘তারপর বলো, সিমির কথা শুনবো।’
সাইফ বলল, ‘ফোনে এতো কথা বলা সম্ভব নয়।’
‘কেন সম্ভব নয়? এখনই সব বলতে হবে এমন তো কোনো কথা নেই। একটু একটু করে বলো। আর বিল নিয়ে চিন্তা করতে হবে না, আমি রিচার্জ করে নিয়েছি।’
‘তারপরেও।’
‘তুমি কি বলবা?’ খানিকটা রাগ দেখিয়ে সিনথিয়া জিজ্ঞেস করলো।
‘আচ্ছা ঠিক আছে বলছি।’
‘হুম, গুড। বলো শুনি।’

সাইফ বলতে শুরু করলো, ‘সিমির সাথে আমার পরিচয় কীভাবে, সেটা নাহয় না-ই জানলে। কিন্তু পরিচয়ের পর আর দশটা ছেলেমেয়ের মতোই স্বাভাবিকভাবে আমাদের কথাবার্তা হয়। প্রথম কয়েকদিন প্রায় সারাদিনই নেটে কথা হতো। তখনই আমাদের দু’জনের মাঝে অদ্ভূত একটা মিল লক্ষ্য করলাম। মিলটা হলো পারিবারিক। আমার যেমন পারিবারিক সমস্যা রয়েছে, তার বেশিরভাগ সমস্যাই ওর ফ্যামিলিতেও ছিল। তাই এতটুকু জীবনে আমাদের দু’জনের অভিজ্ঞতাই সমবয়সীদের চেয়ে একটু বেশি তিক্তই ছিল। এছাড়াও আরো নানা বিষয়ে কথা বলার পর দেখলাম আমাদের দু’জনের চিন্তাধারার মধ্যেও অবিশ্বাস্যরকমের মিল ছিল। এসব মিল থাকার কারণে আমাদের দু’জনের সময় একসঙ্গে খুব ভালো কাটতো।’

‘ওর তখন একটা বয়ফ্রেন্ড ছিল, যার সম্পর্কে আমি খুব বেশি জানতাম না। তবে বয়ফ্রেন্ড আছে, এতটুকু জানতাম। মাঝে মাঝে মনে হতো বয়ফ্রেন্ড থাকায় ভালোই হয়েছে, ওর আর আমার মাঝে কোনো সম্পর্ক গড়ে ওঠার সম্ভাবনা নেই। বেশিরভাগ সম্পর্কই একটা সময় পরে মলিন হয়ে যায়। তখন সম্পর্কের শুরুর সময়ের সেই তীক্ষ্ম অনুভূতিগুলো নষ্ট হয়ে যায়। কারো কারো ক্ষেত্রে এটা হয় মেয়ের, কারো কারো ক্ষেত্রে ছেলের। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটা মেয়েদেরই হয়। এ জন্য ভালোবাসা-রিলেশন এসবের প্রতি বেশ অনীহা ছিল।’

সিনথিয়া বলল, ‘হুম। তারপর?’

‘তারপর একদিন ও ফোন করলো। তাও নিজের নাম্বার থেকে ফোন করেনি, অন্যের মোবাইল দিয়ে ফোন করলো। কারণটা আমি বুঝেছিলাম। ও তখনও চায়নি আমি ওর ফোন নাম্বার পেয়ে যাই। অবশ্য এ জন্য আমার খারাপ লাগেনি। বরং হাসিই পেয়েছিল কিছুটা।’

সিনথিয়া জিজ্ঞেস করলো, ‘তুমি কীভাবে বুঝেছিলে যে ওটা সিমির নাম্বার ছিল না?’
‘সিমি নিজেই বলেছিল যে ওটা তার নাম্বার নয়।’
‘ওহ, আচ্ছা। তারপর?’
‘প্রথম দিন মোটামুটি অল্প কথাবার্তা হলো। আমি কথা বলায় তেমন পটু না তাই বারবার খেই হারিয়ে চুপ করে থাকছিলাম। কিন্তু তার দু-চারদিন পর ও নিজের মোবাইল থেকে ফোন করলো। এরপর মাঝে মাঝেই ও আমাকে ফোন করে খোঁজ-খবর নিতো। আমিও মাঝে মাঝে ফোন দিতাম, কিন্তু প্রায় সময়ই কল ওয়েটিং-এ পড়তাম। তাই পারতপক্ষে আমি ফোন করতামই না। ও-ই ফোন করতো যখন ইচ্ছে হয়। আর বাকি সময় নেটে তো কথা হতোই।’

সিনথিয়া জিজ্ঞেস করলো, ‘ওর বয়ফ্রেন্ড তোমার ব্যাপারে জানতো না? ও আপত্তি করেনি তোমার সাথে ওর মেলামেশা?’
সাইফ বলল, ‘ঠিক মেলামেশা তো না, একটু কথা বেশি হতো, এই আরকি। তবে ওর বয়ফ্রেন্ড জানতো। আর ও বিষয়টা স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছিল। অবশ্য এতে আপত্তি করার মতো তেমন কিছু ছিলও না। আমরা তখনও এমনি ফ্রেন্ড। খুব ভালো ফ্রেন্ডের পর্যায়ে তখনও যাইনি।’
‘তো খুব ভালো ফ্রেন্ডের পর্যায়ে কীভাবে গেলে?’ সিনথিয়ার প্রশ্ন।
‘সেটা মনে রাখার মতো একটা ঘটনা ছিল।’
‘কী রকম?’
‘আমি একদিন শুনলাম ওর রিলেশনে প্রায়ই সমস্যা হতো। বিষয়টা ভুল বোঝাবুঝি ছিল নাকি ছেলেটার অতিরিক্ত পজেজিভনেস ছিল এটা আমার কাছে ক্লিয়ার ছিল না। কিন্তু যেটা ক্লিয়ার ছিল সেটা হলো সিমি কষ্ট পেলে উল্টাপাল্টা কাজ করে বসতো।’
‘যেমন?’
‘যেমন ঘুমের ওষুধ খাওয়া। ও আমাকে অনেকদিন পরে বলেছে যে ও একবার অনেকগুলো ঘুমের ওষুধ খেয়ে ফেলেছিল। এটা শুনে আমার প্রথমে বেশ মেজাজ খারাপ হলেও পরে দুশ্চিন্তা হলো। মনে হলো, আমার লাইফে ফ্রেন্ড বলতে যা বোঝায় তা একমাত্র ও-ই ছিল। বেশ কিছু কারণে আমার সঙ্গে কারোরই তেমন ভালো পরিচয় ছিল না। তাই নিজের কথা শেয়ার করার মতোও কেউ ছিল না। একমাত্র ও-ই ছিল।’

‘একদিন শুনলাম ওদের মাঝে বড় ধরনের কিছু একটা সমস্যা হয়েছে, তখন খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছিল সিমির জন্য। ও কী না কী করে বসে তার কোনো ঠিক নেই। তাই একদিন দুপুরে আমি ওকে ফোন করলাম।’
সিনথিয়া জিজ্ঞেস করলো, ‘কী সমস্যা?’
‘ঠিক মনে নেই। খুব সম্ভবত ওর বয়ফ্রেন্ড ওকে খুব খারাপভাবে কিছু বলে সম্বোধন করেছিল। আসলে ওদের এতো প্রবলেমের কথা শুনেছি যে কোনটা কখন ঘটেছিল তা ঠিক মনে নেই।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি বলো।’
‘ও ফোন ধরলো। আমি ওকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম। ওর মন ভালো করার চেষ্টা করলাম। পরে ও যখন জানতে পারলো যে আমি ফোনই করেছি ওর খোঁজ নেয়ার জন্য, ওর মন ভালো করার জন্য, ও খুব অবাক হলো। ও বলল, ওর নাকি তখন পর্যন্ত এমন কোনো বন্ধু বা বান্ধবী ছিল না যে কি না ওকে ফোন করে ওর খোঁজ নেবে। কথাটা ঐ মুহুর্তে অবিশ্বাস্য মনে হলেও পরে বিশ্বাস করেছিলাম। আমাদের বেস্ট ফ্রেন্ড অধ্যায়ের এখানেই শুরু।’

১২
সকাল থেকে বৃষ্টি হচ্ছে। অবশ্য বৃষ্টি হচ্ছে না বলে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে বললেই বেশি বাস্তবধর্মী হবে। সাইফ যথারীতি সকাল সকাল কলেজে এসে হাজির। ও এসে সাধারণত ক্লাসে দু-চারজনের বেশি কখনোই দেখে না। কারণ, ও একটু বেশি আগেই চলে আসে। ক্লাস শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত এতো সময় বসে থাকাটা অবশ্য তার বেশ বোরিং লাগে। কিন্তু দেরি করে আসাও তার পছন্দ না।

তবে সিনথিয়া সবসময় ক্লাস শুরুর মিনিট বিশেক আগে আসে। কিন্তু আজ ব্যতিক্রম হলো। কলেজের মাঠ তখনো প্রায় ফাঁকা। দু-একজন ছাত্রছাত্রী অলস ভঙ্গিতে হাঁটছে। তাদের মধ্যে সিনথিয়াকে আলাদা করে চিনতে সাইফের কোনো অসুবিধা হলো না। ঘড়ি দেখে অবাক হলো সাইফ। সিনথিয়া এতো সকালে কলেজে আসলো কেন? ক্লাস শুরু হতে এখনো প্রায় এক ঘণ্টারও বেশি বাকি।

সিনথিয়াকে দূর থেকে দেখেই সাইফ সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো। ওর সঙ্গে দেখা হলো মাঠে। সিনথিয়ার সামনে গিয়েই সাইফ বলে উঠলো, ‘তুমি এতো সকালে?’
সিনথিয়া হাসলো, ‘চলে এলাম। গল্প শুনবো বলে।’
‘কিন্তু তাই বলে এতো সকালে? গল্প তো ব্রেকেও শুনতে পারবে।’
‘হ্যাঁ, কিন্তু তর সইছিল না তাই আগেভাগেই চলে এলাম।’

সাইফ অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। অন্য সময় হলে খুব একটা অবাক লাগতো না। কারণ, একজনের ভালোবাসার গল্প আরেকজন শুনতে আগ্রহী হতেই পারে। কিন্তু সিনথিয়ার ক্ষেত্রে বিষয়টা অন্যরকম। ও নিজেই সাইফকে প্রোপোজ করেছিল। ওর তো সাইফের যাকে ভালো লাগে তার কথা শুনতে ভালো লাগার কথা না। কিন্তু ওকে বেশ হাসিখুশি দেখাচ্ছে। গতকাল বিকেলেও আগ্রহী মনে হয়েছে। তাহলে কি ও অভিনয় করছে?

সাইফ নিজের কাছে প্রশ্নটার উত্তর পেলো না। মেয়েরা অভিনয় করলে খুব সূক্ষ্মভাবে অভিনয় করে। সেটা বোঝার সাধ্য খুব কম ছেলেরই আছে। আর সাইফ বেশি ছেলেদের দলে।

আগের দিনের সেই গাছটার নিচে ওরা দু’জন বসলো। গাছটা মূল বিল্ডিং থেকে খুব একটা দূরে না। পায়েচলা পথের পাশেই। তাই এখানে ওরা দু’জন নিশ্চিন্তে বসতে পারবে। কেউ কিছু বলবে না।

সিনথিয়া বলল, ‘বলো। এবার তোমার বেস্ট ফ্রেন্ড অধ্যায়টা শোনা যাক।’

(পর্ব ৬)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s