যেসব বিজ্ঞাপনের সমালোচনা না করে পারা যায় না -৩ : দানবীয় শিশু

 

Horlicks malt powder in jars from India (left)...

Image via Wikipedia

 

প্রথম পর্বঃ তাহলে মেয়েদের প্রতিভা মানেই সৌন্দর্য?
দ্বিতীয় পর্বঃ উচ্ছৃঙ্খল বানানোর প্রতিযোগিতা

ইদানিং টিভি অন করলেই বাহারি বিজ্ঞাপনে চোখ জুড়াতে বাধ্য হয়। গুরুত্বপূর্ণ কোনো অনুষ্ঠান বা সংবাদ দেখতে বসলেও সংবাদের চেয়ে বিজ্ঞাপনই বেশি দেখতে হয়। এসবের বিজ্ঞাপনের একেকটা একেক ধাঁচের। তবে কিছু কিছু বিজ্ঞাপন আছে যেগুলো দেখলে অনেক প্রশ্নই উত্থাপিত হয়। উপরের লিংক দু’টোতে তেমনই দু’টি বিজ্ঞাপন সম্পর্কে আলোচনা পড়তে পারবেন। আজকের বিষয়ঃ হরলিক্স-এর বিজ্ঞাপন।

বছরখানেক আগে হরলিক্সের বিজ্ঞাপন কেমন ছিল তা আমার ঠিক মনে নেই। তবে গত দুই-তিন বছর ধরে হরলিক্স যেন বাচ্চাদের মাথা খেয়ে ফেলার ব্রত করেছে। তাদের টিভি কমার্শিয়াল ‘সব চাই’ বহুদিন ধরেই আমার মাথাব্যাথার কারণ ছিল। কিন্তু সম্প্রতি হরলিক্স যে বিজ্ঞাপন করেছে, তা দেখে চুপ থাকার মতো নয়।

হরলিক্সের সব চাই বিজ্ঞাপন দেখলে মনে হয় বাচ্চা তো নয় একদল সর্বভূক দানবকে দেখছি। আমি বুঝতে পারি না বাচ্চাদের বাচ্চার মতো করে বেড়ে উঠতে দিলে কী সমস্যা। বিজ্ঞাপনদাতাদের লক্ষ্য হলো বাচ্চাদের ‘বাচ্চা থাকাকালীনই’ আইনস্টাইন বানিয়ে দেয়া। বিজ্ঞাপনই বলাই হয়, টলার, স্টংগার, শার্পার। কেন? খোদ আইনস্টাইনও তো কোনো “ওষুধ” খেয়ে আইনস্টাইন হননি। হ্যাঁ, হরলিক্সকে আমি ওষুধই বলছি। কারণ হরলিক্স যে ধাঁচে বিজ্ঞাপন করে, এতে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় হরলিক্স হলো বাচ্চাদের বড়দের চেয়েও দ্বিগুন জ্ঞান-শক্তি-উচ্চতা দিয়ে গড়ে তোলার ওষুধ। প্রতিটি বাচ্চারই হরলিক্স চাই। বাচ্চাদের আর বাচ্চা থাকা যাবে না। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে বাচ্চাদেরও রোবট হতে হবে। সব পেতে হবে।

এসব বিজ্ঞাপনের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো অভিভাবকের উপর এর ‘সফল’ প্রভাব। বিজ্ঞাপনগুলো দেখে অভিভাবকরাও অস্থির হয়ে পড়েন তাদের বাচ্চাদের দানব করে তুলতে। আর এ অস্থিরতার শিকার, আজকের শিশুরা।

কেন? বাচ্চাদেরকে বাচ্চার মতো করে বড় হতে দিন না। ওদের খাদ্য ও পুষ্টি এবং অন্যান্য বিষয়গুলো নিশ্চিত করলেই তো হয়। বাচ্চাকে অল্প বয়সীই সর্বজ্ঞানী করে তোলার প্রয়োজন কী? হয়তো এই ট্রেন্ডটা তৈরি হতো না। হরলিক্সের মতো মুনাফালোভী বিজ্ঞাপনদাতাদের জন্যই বাংলাদেশে অভিভাবকদের মধ্যে এই ট্রেন্ডটা ঢুকে পড়েছে। বাচ্চাকে বাচ্চা থাকতে দেবে না। তাকে ছোট বয়সেই বড় বানিয়ে ছাড়বে। কী আশ্চর্য‍!

মানুষ বিজ্ঞাপন দেখে প্ররোচিত হয়। সবাই না হলেও অধিকাংশই হয়। ছোট বাচ্চাদের নিয়ে হরলিক্সের এ জাতীয় বিজ্ঞাপন দেখে যারা প্ররোচিত হন না, কেবল তারাই বুঝতে পারেন কতোটা হাস্যকর ও ক্ষতিকর এসব বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনে অভিনয় করা বাচ্চাগুলো অন্যের চোখে স্টার হতে পারে, কিন্তু আমার চোখে ওরা দানব। হরলিক্স আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে দানব বানানোর পরিকল্পনা করেছে। আর তারা এ কাজে প্রশংসনীয় সফলতাও কুড়িয়েছে। অভিনন্দন হরলিক্স! বাচ্চাদের ‘বাচ্চা’ ভাব (যেটা তাদের মধ্যে থাকা উচিৎ) দূর করতে তোমাদের তুলনা হয় না!

শেষ করবো সাংবাদিক ফারুক ওয়াসিফের একটি লাইন দিয়ে। তিনি লিখেছেনঃ

ইতিহাসে স্বর্ণযুগ চিহ্নিত থাকে, কিন্তু আইয়ামে জাহেলিয়াত বা অন্ধকার যুগের সূচনায় কোনো ঘণ্টা বাজে না। নীরবেই তা শুরু হয়ে যায়। এক চীনা জল্লাদের সাধনা ছিল, এমনভাবে মানুষের কল্লা কাটা, যাতে তারা টেরও না পায়। বছরের পর বছর তিনি সূক্ষ্মভাবে মানুষের মাথা কাটার সাধনা চালিয়ে গেলেন এবং একদিন এত নিখুঁতভাবে একজনের মাথা কাটলেন যে হতভাগা লোকটি কিছু টের না পেয়ে প্রশ্ন করে, ‘কই, আপনি তো কিছু করছেন না।’ জল্লাদ মহাশয় সাধুপুরুষের মতো হেসে বললেন, ‘জনাব, মাথাটা একটু ঝাঁকান, টের পাবেন।’ ঝাঁকুনি না খেলে আমরাও বুঝব না, আমাদেরও মাথা বিনোদনের রেশমি সুতোয় কত সুকৌশলে কাটা পড়ছে। — দৈনিক প্রথম আলো, শুক্রবার, ৮ই অক্টোবর, ২০১০।

বিনোদন আর ট্রেন্ডের মুখে পড়ে আমাদেরও মাথা (এবং মাথার সঙ্গে বুদ্ধিও) কাটা পড়ছে। তিনি যথার্থই লিখেছেন। একদিন আমরা ঠিকই টের পাবো এসব বিজ্ঞাপন কী ভয়াবহ আছর করছে আমাদের সমাজে। কিন্তু ততোদিনে অনেক দেরি হয়ে যাবে।

3 responses

  1. আসলেই তাই….ব্যাপারটি আমার মাথায় এসেছিল………এই ধরনের এড শুধু মাএ উম্মাদনায় সৃষ্টি করে……….আসলে যদি এগুলো মানুষকে আইনস্টাইন বানিয়ে দিতে পারত তাহলে আর তো পড়াশুনার দরকারই হত না……..
    আচ্ছা যার এই এ্যাড গুলো তাদের মাথায় কি ঘিলু বলে কিছু নেই,,

  2. সহমত আপনার সাথে। তবে এই ধরনের আলোচনাগুলি জাতিগত ভাবে সকল মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে কিভাবে? যেহেতু আমাদের এই ধরনের কথা বার্তা দৈনিক পেপারে বা টিভিতে প্রকাশ পায়না তাই আমরা আমাদের পক্ষে সহজ মাধ্যম ব্লগকে বেছে নিয়েছি কিন্তু সবাইতো ব্লগ পড়েনা। সবাইতো ব্লগ লেখেও না। কার এতো সময় আছে কষ্ট করে ব্লগ পড়ার। তবে কিভাবে সকলের কাছে সহজে পৌঁছে দেয়া যায়? আমরা কেমন করে সাধারন জনগন এক মতে পৌঁছার জন্য একটা মাধ্যম পেতে পারি? ম্যাসিভ্‌ পিপুল কিভাবে কোন বিষয়ে একমতে পৌঁছাবে?

    যাই হোক, বিজ্ঞাপন নিয়ে বলি। আমারো দুটি জমজ শিশু আছে। আমিও এই ধরনের বিভিন্ন বিজ্ঞাপনে বিরক্ত। আমি অনেকটা হিসাব করেই আমার শিশুদের প্রোগ্রাম দেখাই। সকল অভিভাবককে না পারি, অন্তত আমার শিশুদুটি যেন ভালো অভিভাবক হতে পারে।

  3. Pingback: একটা ব্লগে কমেন্ট করেছি | সুনাতা মেহেদী

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s