বিশালতার মাঝে একদিন-1

রাত করে ঘুমিয়েছি। তাই নিজে থেকে ঘুম ভাঙছিল না। অবশ্য আমি সন্ধ্যায় ঘুমিয়ে পড়লেও নিজ থেকে কখনোই আমার ঘুম ভাঙে না। 😉 তবে সেদিন একটু বেশিই টায়ার্ড থাকায় আম্মুর দশ-বারোবার ডাকার পরও ঘুম ভাঙেনি। পরে আমার বিরুদ্ধে মোটামুটি একটা যুদ্ধ ঘোষণা করা হলো। লক্ষ্য, আমাকে ঘুম থেকে উঠানো। অবশ্য যুদ্ধের প্রথম আক্রমণেই আমি হেরে গেলাম। যাই হোক, ঘুম থেকে উঠা মাত্রই আফসোস করা শুরু করলাম আরেকটু আগে কেন উঠলাম না। ঘড়িতে তখন প্রায় ছ’টার কাছাকাছি। সাতটার মধ্যে মোহাম্মদী গেস্ট হাউজের সামনে থাকতেই হবে যে কোনো উপায়ে।

তড়িঘড়ি করে কোনোরকমে হাত-মুখ ধুয়ে তৈরি হয়ে নিলাম। আম্মু-আব্বু, আপু আর মামা-মামি আগেই তৈরি হয়েছিল। অবশ্য আমার তৈরি হওয়ার জন্য কেউ বসে থাকেনি। সবাই মেকআপে ব্যস্ত। মনে হয় আরো দু’চার ঘণ্টা সময় থাকলে আরো দু’চার ঘণ্টাই টানা মেকআপ চলতো। 😐

যাই হোক, সাতটা বাজার দশ মিনিট আগে বের হলাম আমরা সবাই। ফ্ল্যাট থেকে মোহাম্মদী গেস্ট হাউজ পাঁচ মিনিটের পথ। সঙ্গে একটি না দু’টি ব্যাগে সারাদিনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। গেস্ট হাউজের সামনে এসে দেখলাম বাস অনেক আগেই চলে এসেছে। কিন্তু দেরি করার ফল হলো সবার পেছনের সিট! ধুর! মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেল।

যাই হোক, বাসে উঠার পরও প্রায় 30 মিনিট পর বাস ছাড়লো। পাংচুয়ালিটি বা সময়ানুবর্তিতা জিনিসটা বাংলাদেশে একেবারেই নেই। আর আমি মনে করি যাদের মাঝে আছে তাদের উচিৎ ‘দেশের’ সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার উদ্দেশ্যে সময়ানুবর্তিতা ছেড়ে দেয়া। কারণ আমি নিজেই বহুবার এমন বিভিন্ন প্রোগ্রাম ইত্যাদিতে সময়মতো গিয়ে দেখি বেশি আগে চলে গেছি। 😐 যেমন, জাতীয় প্রেসক্লাবে একদিন সকালে 9টায় একটা প্রোগ্রাম হওয়ার কথা ছিল। বারবার বলে দেয়া হয়েছে সময় যেন ঠিক থাকে। আমি 8.45মিনিটে গিয়ে দেখি কারো কোনো খবরই নেই। সেই অনুষ্ঠান শুরু হয় 10.45-এর দিকে।

যাই হোক, বাস ছাড়ার পর বেশ ভালো লাগলো। সকালের দৃশ্য এমনিতেই খুব সুন্দর। তার উপর ঘন কুয়াশা পড়েছে। ড্রাইভার কীভাবে গাড়ি চালাচ্ছিল সেটাই চিন্তার বিষয় ছিল। আঁকাবাঁকা রাস্তা পেরিয়ে পাহাড়-পর্বতের মধ্য দিয়ে ছুটে চলছিল আমাদের বাস। এর মধ্যে নাস্তা দেয়া হয়, তবে কারোরই তেমন খিদে না থাকায় সবাই নাস্তা রেখে দেই।

দারুণ ও মনে রাখার মতো প্রচুর দৃশ্য দেখার পর অবশেষে 11.30 থেকে 12.00 টার মধ্যে কোনো এক সময় আমাদের বাস গন্তব্যে পৌঁছলো। বাস থেকে নামলাম। সেখানে উঠতে হবে আরেক যানে। সেটার পাস ছিল আমাদের কাছে। পাস দেখিয়ে টিকেট নিলাম। তারপর রোমাঞ্চকর এক যাত্রার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম রোমাঞ্চকর এক ব্রিজের উপর দিয়ে।

সবার মুখে জাহাজ-জাহাজ শুনলেও নিজ চোখে দেখে সাধারণ একটা লঞ্চই মনে হলো, যদিও এগুলোর কাজ বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। যাই হোক, জাহাজে উঠে পড়লাম আরেক বিপদে। সিট নেই। এজেন্সি থেকে সিটের কথা বলা হলেও এখানে এসে দেখলাম ডেকের উপর কতগুলো প্লাস্টিকের চেয়ার ছাড়া আর কোনো সিট নেই। ভেতরে বসার জায়গা দেখলেও সেখানে কাউকে ঢুকতে দিতে দেখলাম না। ভয়াবহ রোদে গা পুড়ে যেতে লাগলো। কিন্তু কিছু করার ছিল না। ডেকের ছায়ার সাইডটা লোকে পরিপূর্ণ। এখনই যদি রোদেই বসা না যায়, তাহলে পরে আর বসাই যাবে না। তাই কোনোরকমে সবার জন্য চেয়্যার রাখা হলো। পরে অবশ্য বুঝেছিলাম সিটের দরকার পড়ে না। জাহাজ চলতে শুরু করলে মানুষ কেউ ভেতরে থাকে না। সবাই বাইরে চলে এসে ঘোরাঘুরি করে। যত রোদই হোক, তখন ঠান্ডা বাতাস লাগতে থাকে।

যাই হোক, বরাবরের মতোই নির্ধারিত সময়ের 45 মিনিট পর জাহাজ ছাড়লো। সবার মধ্যেই একটা উত্তেজনা।জাহাজ ছাড়ার আগে স্পিকারে একবার কোরআন তেলাওয়াত হয়েছিল। ব্যাপারটা ভালোই লেগেছিল। যেন বিপদের মুখে রওনা দেয়ার শেষ মুহুর্তে সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করা।

যাই হোক, কিছু দূর যেতে না যেতেই আমরা সবাই হারিয়ে গেলাম প্রকৃতির এক অচেনা পরিবেশে। দারুণ সব দৃশ্য উপভোগ করতে থাকলাম। জাহাজে লোকসংখ্যা অতিরিক্ত ছিল। নাহলে মজাটা আরেকটু বেশিই করা যেত।

কতক্ষণ পর জাহাজ এলো বিপদজনক অঞ্চলে। পুরো জাহাজ দুলতে শুরু করলো। একটু ভয় ভয় করলেও ভয়ের চেয়ে ব্যাপারটা উপভোগই করছিলাম। একরকম হঠাৎ করেই যেন খোলা সাগরে চলে এলো জাহাজটি। আমাদেরও চোখ জুড়াতে থাকলো পাহাড়-পর্বতের মনোরম সব দৃশ্য।

কক্সবাজার

যাই হোক, প্রকৃতির মধ্য দিয়েই চলতে থাকলো আমাদের যাত্রা। কিছুক্ষণ পর স্পিকারে গান ছাড়া হলো। দারুণ একটি গান। আগে কখনো শুনিনি গানটি। তাছাড়া পরিস্থিতি ও জায়গার সঙ্গে গানটা দারুণভাবে ম্যাচ করেছিল। গানটি হলো ক্লান্তির শহর ছেড়ে। এখনো গানটি প্রায় প্রতিদিনই শুনি। যতবারই শুনি, ততবারই মনে পড়ে সেই স্মৃতি।

গানটি ডাউনলোড করতে পারবেন এখান থেকে। গান শোনার সময় পোস্টটি পড়লে ভালো লাগবে। 🙂

এর মধ্যে আরেকটা কাণ্ড ঘটলো। পিচ্চি একটা জাহাজ কোত্থেকে যেন উদয় হলো। আমরা অনেক দূর থেকে প্রথমে ওটার অস্তিত্ব দেখলাম। তারপর ধীরে ধীরে বিন্দুটা বড় হতে থাকলো এবং একসময় দেখলাম আমাদের একেবারে কাছে চলে এসেছে। যদিও জাহাজের নিজস্ব কোনো ভাষা বা মুখভঙ্গি নেই, তবুও আমাদের পাশ কাটানোর সময় যেন মনে হলো কত ভাব দেখিয়ে পাশ কাটাচ্ছে!

সেইন্ট মার্টিন

যাই হোক, এসবের মধ্য দিয়েই চলতে থাকলো আমাদের যাত্রা। প্রায় তিন ঘণ্টা পর অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম পানির রঙ বদলে যাচ্ছে। একটু আগের সেই পানি আর নেই। অদ্ভূত এক রঙ ধারণ করেছে পানি। মনে হচ্ছিল ভিন্ন কোনো জগতে চলে এসেছি আমরা হঠাৎ করেই। লক্ষ্য করে দেখলাম, আশেপাশে বা দূর-দূরান্তে যত দূরেই চোখ যায় পানির এই একই রঙ। অবাক লাগলো এভাবে রঙ বদলে যাওয়া দেখে। মনে হচ্ছিল অস্বাভাবিক আকারের বিশাল এক সুইমিং পুলে চলে এসেছি! আর বদলে যাওয়া রঙে যখন ফেনা তুলে আমাদের জাহাজ এগিয়ে যাচ্ছিল, সেই দৃশ্য কেবল উপভোগ করাই যায়, বর্ণনা করা যায় না।

সেইন্ট মার্টিন

মুগ্ধ হয়ে এই দৃশ্য দেখতে থাকলাম। ফটোগ্রাফিতে শখ থাকায় ক্যামেরায় ছবিও তুলছিলাম। কিন্তু ঐ সময়টায় এমন মনে হচ্ছিল যে ছবি তোলার কিছু নেই। যেদিকেই তাকাই কেবল পানি আর পানি। ডাঙার নাম-গন্ধও নেই। খালি পানিতে কী ছবি তুলব খুঁজে পেলাম না।

অনেকক্ষণ পর অবশেষে দেখা পেলাম প্রত্যাশিত সেই ডাঙার। প্রথমে বিন্দু হয়ে দেখা দিয়ে ধীরে ধীরে বড় হতে থাকলো। আমরা সবাই নিশ্চিত হতে পারছিলাম না এটাই সেই জায়গা কি না। তবে যখন জাহাজের দিক ঘোরানো হলো, বুঝতে বাকি রইলো না, বিশাল এক সমুদ্রের মাঝে, বাংলাদেশের এক কিনারে, সেইন্ট মার্টিন আমাদের সামনে উপস্থিত।

[পরবর্তী পর্বে সমাপ্য]

3 responses

  1. আমার জীবনে যত প্রিয় মূহুর্ত আছে, তার অর্ধেকই বোধ হয় সেন্ট মার্টিনে। ভার্সিটির বন্ধুরা সবাই গিয়েছিলাম স্যারদের সহ। অসাধারণ স্মৃতি

  2. Pingback: বিশালতার মাঝে একদিন – ২ | আমিনুল ইসলাম সজীবের বাংলা ব্লগ

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s