একটি গুলি..একজন পুলিশকে বাঁচানোর চেষ্টা..এবং তারপর..মৃত্যু!

চারিদিকে প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ। মানুষের দিগ্বিদিক ছোটাছুটি। এরই মাঝে ছুটে এসে একুশ বছরের এক ছাত্রের হাঁপাতে থাকা। হঠাৎই পাশে হাতে গুলি খেয়ে পুলিশের একজন কর্মকর্তা মাটিতে লুটিয়ে পড়া। পুলিশের লোকটিকে বাঁচাতে সেই ছাত্রের দৌড়ে যাওয়া। সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি গুলির শব্দ। তারপর পুলিশকে বাঁচাতে যাওয়া সেই ছাত্রেরও মাটিতে লুটিয়ে পড়া। বার দুয়েক “আরাফাত আরাফাত” নাম উচ্চারণ করা। এবং তারপর…মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া।

না, যেকোন যুদ্ধের সিনেমার চেয়ে ভয়াবহ হলেও ঘটনাটি একটি বাস্তব সত্য। গত বুধবার বিডিআরের তথাকথিত বিদ্রোহে অসংখ্য সেনা কর্মকর্তার পাশাপাশি নিহত হয় তিনজন সিভিলিয়ান। তাদের মধ্যে একজন হচ্ছেন পিপলস ইউনিভার্সিটি অফ বাংলাদেশের বিবিএ’র ছাত্র খন্দকার তারেক আজিজ (ডাকনাম সজীব)। একুশ বছর বয়সী এই যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যুর সচিত্র প্রতিবেদন প্রচারিত হয়েছে দেশের প্রায় সবক’টি স্যাটেলাইট চ্যানেলে। কাকতালীয়ভাবে তারেক আজিজ সজীবের বড় বোন আমার বড় বোনের খুব কাছের বান্ধবী। তাই মর্মান্তিক মৃত্যুর দুঃসংবাদটা আমাদেরকেই প্রথম পেতে হয়েছিল।

তারেক আজিজ (সজীব) মা-বাবার দ্বিতীয় সন্তান। তার বড় বোন পায়েলের বিয়ে হয়ে গেছে। ছোট ভাই শুভ। বয়স আট কি নয় বছর। ঢাকার টোলারবাগে একটি ফ্ল্যাটে সপরিবারে থাকতো সজীব। খুব উচ্ছল, প্রাণবন্ত একটি ছেলে ছিলো সে। প্রচুর কথা বলতো। খুব হাসাতে পারতো সবাইকে। এছাড়াও খুব মিশুক প্রকৃতির ছিলো। সবাইকে খুব সহজেই আপন করে নেয়ার ক্ষমতা ছিলো ওর। আমি অবশ্য সজীব ভাইয়াকে দেখিনি। আমি শুধু পায়েল আপু আর শুভকেই চিনতাম। দুঃসংবাদটি শোনার পর দেরি না করে আমি, আমার বোন আর দুলাভাই রওনা হলাম সজীব ভাইয়াদের বাসায়। রাত প্রায় এগারোটার দিকে পৌঁছলাম টোলারবাগস্থ ফ্ল্যাটে। সেখানে ছিল এক করুণ পরিস্থিতি। কেউ কল্পনাও করতে পারেনি গতকালের প্রাণচঞ্চল যুবক আজ লাশ হয়ে পড়ে থাকবে ঢাকা মেডিকেলের মর্গে। অথচ কল্পনাকেও হার মানিয়ে ঠিকই নিষ্ঠুর বাস্তবতা সজীবকে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিডিআরের গুলিতে নিহত করে মা-বাবার সান্নিধ্য থেকে অনেক দূরে সরিয়ে দিয়েছে।

সজীব ভাইয়ার মা বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন। ছেলের রক্তাক্ত চেহারা টেলিভিশনের পর্দায় দেখে বারবার চিৎকার করে উঠছিলেন। বিডিআরের একটি গুলি তারেক আজিজ সজীবের মাথার একপাশে লেগে মাথা ভেদ করে অন্যপাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। ফলে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় তার। তার মৃতদেহ কয়েকজনে মিলে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য বারবার প্রদর্শিত হয় চ্যানেল আইসহ বেশকিছু চ্যানেলে, যা দেখে বারবার কেঁদে উঠছিলেন সজীব ভাইয়ার মা। অন্যদিকে সজীবের বাবা অনেক শক্ত। নিজেকে সামলাতে পেরেছিলেন তিনি। কারণ তিনি জানতেন, পরদিন (বৃহস্পতিবার) তাকে অনেক কাজ করতে হবে। ঢাকা মেডিকেলের মর্গ থেকে পোস্ট মর্টেম করানোর পর লাশ আনতে হবে। তারপর আবার তাকে তাদের দেশের বাড়ি নিয়ে যেতে হবে। ভেঙে পড়লে চলবে না। তবে তার চোখও সময় সময় ভেজা দেখা যাচ্ছিলো। টেলিভিশনের পর্দায় ছোট ভাইয়ের ছবি দেখে বড় বোন পায়েল আপুও চোখের পানি ধরে রাখতে পারছিলো না। বড় আদরের ভাই ছিলো ওর।
আর ছোট ভাই শুভ। ওর কান্না থামানো মুশকিল হয়ে পড়েছিল। সজীব ভাইয়ের রক্তাক্ত মৃতদেহ টিভিতে দেখার পর তার সে কি প্রশ্ন! “বিডিআররা আমার ভাইকেই কেন মারলো? বিডিআররা আমার ভাইয়ার কাছে টাকা চাইতো, তাহলেই তো টাকা দিয়ে দিতো। কী দোষ করেছিলো আমার ভাইয়া? গুলি মাথায়ই লাগলো কেন? পায়ে বা হাতেও তো লাগতে পারতো? বিডিআর গুলি কেন করলো? আমি বিডিআরকে ছাড়বো না!” এরকম শত শত জবাব না জানা প্রশ্ন করে যাচ্ছিল শুভ একনাগাড়ে। এভাবে একসময় জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়লো শুভ।
ঘরের অন্যান্য সদস্যদেরও একই অবস্থা। কেউ কথা বলছিলো না, কেউ পাথরের মতো চুপচাপ বসেছিলো। কেউ বা আবার স্মৃতিচারণ করছিলো সজীবের বেঁচে থাকার সময়কার স্মৃতিময় কথা। সজীবের খুব কাছের বন্ধু আরাফাত, যার নাম গুলি খাওয়ার পরপর মুখে এনেছিল সজীব। সে বললো, দুপুর আড়াইটার দিকে অচেনা এক নাম্বার থেকে ফোন রিসিভ করে সে। অপরিচিত একজন লোক জানায়, পুলিশের লোককে বাঁচাতে গিয়ে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন তারেক আজিজ। প্রথমে আমি বিশ্বাস করতে পারিনি তিনি সত্যি কথা বলছেন। পরে অবশ্য ইবনে সিনা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানে ডাক্তাররা তাকে মৃত ঘোষণা করে পোস্ট মর্টেমের জন্য ঢাকা মেডিকেলে পাঠিয়ে দেয়।

রাতে থমথমে এক পরিস্থিতি বিরাজ করছিল সজীবের ঘরে। কারো চোখে ঘুম নেই। কেউ বিশ্বাস করতে পারছিলো না সজীব আর নেই। আর কোনোদিন কথা বলে সারা ঘর মাথায় তুলবে না সজীব। সজীবের বাবা জানায়, কিছুদিন আগেও নাকি সজীব বলছিলো, “আমাকে ঘরেই সবাই শুধু অভদ্র অভদ্র বলে ডাকে। বাইরে সবাই আমাকে ভালো জানে। দেখে নিয়ো, আমি এমন কোন ভালো কাজ করবো, যাতে সব টিভি চ্যানেলে আমাকে ফলাও করে দেখানো হয়।” তখন তো আর সে ভাবতেও পারেনি, টিভি চ্যানেলে তাকে দেখানো হবে ঠিকই, তবে জীবিত সজীবকে নয়, নিহত ও রক্তাক্ত সজীবের লাশকে।
রাতে জোরাজুরি করে শুতে যেতে বলল বাসার সবাই। সজীব ভাইয়ার খাটেই আমি শুয়েছিলাম। পাশে ছিলো শুভ ও তার বাবা। উল্লেখ্য, আমার ডাকনামও সজীব। তখন আঙ্কেল বলে উঠলেন, কাল এই বিছানায় শুয়েছিল সজীব। আজও এই বিছানায় সজীব শুয়ে আছে। কিন্তু আমার সজীব আর নেই!

রাত তিনটায় বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। তখন সজীব ভাইয়ার বড় বোন পায়েল আপুও বারান্দায় গেলো। বললো, গতকালও এই সময় সজীব পাশের ঘরে ঘোরাঘুরি করছিল। আমার আগে ও কোনদিন শুয়ে পড়তো না। অথচ আজ ও আমার আগেই শুয়ে আছে। মর্গে।

পায়েল আপুকে সান্তুনা দেবার ভাষা আমার জানা ছিলো না।

[এতো এতো উচ্চপদস্থ সেনাকর্মকর্তার মৃত্যুর আড়ালে হারিয়ে গেছে তিনজন সাধারণ মানুষের করুণ মৃত্যুর কথা। আমরা যদি স্বাভাবিকভাবে বিচার করি, তাহলে দেখবো, উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তার আগে তাদের প্রত্যেকেরই একটা পরিচয় আছে। সেটা হলো এই যে, তারা মানুষ। একইভাবে নিরাপরাধ তিনজন বেসামরিক ব্যক্তিও মানুষই ছিলেন। সাধারণ রিক্সাওয়ালা বা সজীবের মতো তরুণদের বেঁচে থাকার অধিকার সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। কিন্তু তাদের কথা বলার কেউ নেই। মূলত এজন্যই এই পোস্টটি লিখি আমি।]

উল্লেখ্য, পোস্টটি প্রথমে সা.ইন ব্লগে প্রকাশিত হয়েছিল

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s