আজ থেকে ঠিক এক বছর আগের এই দিনে কলেজে ভর্তির জন্য গিয়েছিলাম। তারচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, সেদিনের আবহাওয়া ঠিক আজকের মতোই ছিল। আজ সকাল থেকেই যেমন টুপটাপ বৃষ্টি পড়ছে, সেদিনই ঠিক একইভাবে সকালে টুপটাপ বৃষ্টি পড়ছিল। তবে সেদিন বের হওয়ার সময় ইচ্ছে করেই ছাতা নেইনি। কারণ, তখন আকাশের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল আর বৃষ্টি আসবে না। ঠিক আজ সকালে যেমন মনে হয়েছে।
গত বছরের এই দিন বের হয়ে বেশ বিপদে পড়েছিলাম। কোনো বাসই পাচ্ছিলাম না। ভাবছিলাম ভর্তির দিন, দেরি হলে আবার কি না কি সমস্যায় পড়তে হয়। সিএনজি নেব ভাবছি এমন সময় ভাগ্যক্রমে একটা বাস পেয়ে যাই। তৃতীয়বারের মতো যাই কলেজে। প্রথমবার গিয়েছিলাম ফরম আনতে। দ্বিতীয়বার রেজাল্ট জানতে। আর সেবার ভর্তি হতে। তবে কলেজে ভর্তি হতে যে এতো কাঠ-খড় পোড়ানো লাগবে সেটা কে জানতো।
বাস থেকে মহাখালী ফ্লাইওভারের কাছে নামলাম। তখন একেবারে কাকভেজা বা বিড়াল-কুকুর ভেজা বৃষ্টি যেটাই বলেন হচ্ছিল। ফ্লাইওভার থেকে কলেজে পৌঁছতে পৌঁছতে ভিজে চুপসে গেলাম। শার্ট-প্যান্ট দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছিল। কলেজে পৌঁছে শাহীন হলে ঢুকেই পড়লাম আরেক বিপদে। এতোগুলো এসির মধ্যে মনে হলো যেন শীতকালে ডিপ ফ্রিজে ঢুকে পড়েছি। অবশেষে কলেজে ঢুকতে পারলাম প্রথমবারের মতো।
প্রথম দর্শনে কলেজটা পছন্দই হলো। প্রথমবার দেখেছি বলে আসলে যতোটা বড় তারচেয়ে অনেক বেশি বড় মনে হয়েছিল। সবুজ ঘাসে ভরা বিশাল মাঠ। সামনে সুন্দর বাগান। তারপর ক্যান্টিনের সঙ্গে উদ্যান। প্রথম দর্শনে ভালো লাগার মতোই ক্যাম্পাস ছিল বিএএফ শাহীন কলেজ ঢাকার ক্যাম্পাস।

বৃষ্টিভেজা শাহীন ক্যাম্পাসের প্রধান প্রবেশ মুখ।
প্রথমদিন অনেকক্ষণ বিশাল লাইনে বসে থেকেই বুঝতে পারছিলাম না আসলে হচ্ছেটা কী। অনেকক্ষণ বসে থাকার পর পারমিশন স্লিপ পেলাম। তারপরও নিশ্চিত হতে পারলাম না। যখন মার্কশিট জমা নিয়ে রোল নম্বর লিখে দিল, তখন নিশ্চিত হলাম।
শুরু হলো কলেজ লাইফ।
ভর্তির পর অনেকদিন বৃষ্টির জন্য কলেজে যাওয়াই অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। এটা নিয়ে ইংরেজি ব্লগে একটা পোস্ট লিখেছিলাম যেখান থেকে উপরের ছবিটা নিয়েছি।
ভাবতে বেশ অবাক লাগে। কোনদিন দিয়ে কীভাবে যেন এক বছর কেটে গেছে। সবাই বলতো ইন্টারে পড়ার সময় সময় কোনদিক দিয়ে যায় টের পাওয়া যায় না। আজ সকাল থেকে সেটাই মনে হচ্ছে বারবার। ভর্তির সময় মাঠে দেখা সেই সবুজ ঘাস শুকিয়েছে আমাদের সামনেই। সব ঝরে পড়েছে, পুরো মাঠের রং হয়েছে হলদেটে। বালু দিয়ে ভরে গেছে পুরো মাঠ। সেই বালু কোথায় যেন উধাও হয়ে আবার ধীরে ধীরে গজিয়ে উঠেছে ঘাস। এখন শাহীনের মাঠ আবারও সম্পূর্ণ সবুজ। আজ ফার্স্ট ইয়ারের ভর্তির দিন। আজও আমার মতো আরও অসংখ্য ছেলে শাহীনের মাঠে ঢুকবে। আমার অনুভূতিগুলোই আজ আবার সংক্রামিত হবে আরও অনেকের মাঝে।
কলেজে এক বছর কেমন কেটেছে এই প্রশ্ন করে অনেকে। আসলে কেমন কেটেছে ঠিক জানি না। বছরের বেশিরভাগ সময়ই কেটেছে বন্ধে। এই বন্ধ-সেই বন্ধ দিয়ে একটা বড় অংশ বাসায় বসেই কেটেছে। বড় আপু বলে, আমাদের মতো এতো বন্ধ হিংসা করার মতো। একটা উদাহরণ দেই, এইচএসসি চলাকালীন দুই মাসে মাত্র ১৪ দিন ক্লাস হয়েছে। তাও ঠিকভাবে এই ১৪দিনই ক্লাস হয়নি। এইচএসসি শেষ হওয়ার পরদিনই গ্রীষ্মের ছুটি দিয়েছে ২০ দিন। খোলার প্রায় এক সপ্তাহ পর আবার পেয়েছি ফার্স্ট ইয়ারের ভর্তির জন্য টানা তিনদিন বন্ধ।
বলার মতো তেমন কোনো মজা না করলেও মনে রাখার মতো একটা বছর নিঃসন্দেহে গেছে শাহীন কলেজে। বিশেষ করে জানুয়ারি মাসে খেলাধূলা আর প্যারেডের সময় সবচেয়ে ভালো দিন গেছে। ক্লাসে হাজিরা দিয়ে ক্যান্টিনে গিয়ে নাস্তা খাওয়া আর তারপর প্যারেড ফাঁকি দেয়ার তালে সারা কলেজে মিশন ইমপসিবল স্টাইলে দৌড়ে বেড়ানো, আর প্যারেড কমান্ডার লাইনের সামনে আসামাত্রই স্যারদের সামনে দিয়ে বুক ফুলিয়ে হাঁটার মজা মনে রাখার মতো।
আমাদের পরীক্ষা হয়ে গেছে আরও দুইমাস আগে। এখন আমাদের আসল পরীক্ষার প্রস্তুতি নেবার পালা। ফার্স্ট ইয়ার চলে এসেছে, এবার আমাদের বিদায়ের ঘড়ি ঘুরতে শুরু করেছে। সবাই এখন নতুনদের নিয়ে ব্যস্ত থাকবে, আর হয়তো আমার স্কুলের টিচারদের মতো কবে আমরা বিদায় হবো সেই প্রহর গুণতে শুরু করেছেন টিচাররা।
আর যাই হোক, কলেজটাকে মিস করবো। এখনই এই কথা মনে হচ্ছে। সেশন শেষে কেমন লাগবে তা আর ভাবতে ইচ্ছে করছে না।