
মাস কয়েক আগে নতুন একটা সেট কিনেছি । সেটটার আসল বৈশিষ্ট্য সেট নিজে নয়, বরং এর সঙ্গে থাকা হেডফোনটি। সত্যিই দারুণ মিউজিক এক্সপেরিয়েন্স দেয় হেডফোনটা। তাই কেনার পর ভাবলাম, এখন আর কোথাও বিরক্ত হয়ে বসে থাকা লাগবে না। যখন কোথাও অপেক্ষা করতে হবে, লাইনে দাঁড়িয়ে থাকবে হবে, হেডফোন লাগিয়ে গান শুনতে থাকবো। গান বলতে অবশ্য মেমোরি কার্ডের গান বোঝাচ্ছি। অনেক চেষ্টা করেও এফএম রেডিওগুলো শোনার ধৈর্য্য তৈরি করতে পারেনি। যদি কোনোদিন এমন এফএম স্টেশন বের হয় যেখানে আরজে বলে কিছু থাকবে না তাহলে সেই স্টেশন শুনবো।
গান শুনে আমি সময় কাটাতে পারি ভালো। যদিও আমার গানের কালেকশন খুবই অল্প, তবুও এর প্রত্যেকটা গানের সঙ্গেই কিছু না কিছু স্মৃতি জড়িয়ে আছে। কোনোটা নস্টালজিক হওয়ার মতো (সবচেয়ে বেশি নস্টালজিক মিউজিক হচ্ছে গডফাদার এর থিম। এ নিয়ে পরে আরেকটা পোস্ট করবো ভাবছি।), কোনোটা মজার কোনো মূহুর্ত মনে করিয়ে দেয়ার মতো ইত্যাদি। তাই নতুন হেডফোন পেয়ে বেশ খুশিই হয়েছিলাম।
কিন্তু মজার (অথবা বিরক্তিকর) ব্যাপার হলো, হেডফোন পাওয়ার পর এখন আর গান শোনার সময় পাচ্ছি না। আগে অনেক সময়ই অপেক্ষা করে বা বসে থেকে কাটাতে হতো। তখন মনে হতো, ইশ একটা হেডফোন থাকলেই গান শোনা যেত। বাজারের চার-পাঁচশ’ টাকার হেডফোনে গান শুনে মজা নেই। আবার হাজার হাজার টাকা দিয়ে হেডফোন কেনার লাক্সারিও নেই। তাই সেট কেনা পর্যন্তই অপেক্ষা করি। কিন্তু সেট পাওয়ার পর দেখছি এখন আর গান শোনার অকেশন আসছে না! ![]()
এই যেমন, আজ সকালে গ্যাসের বিল দিতে ব্যাংকে গেলাম। যাওয়ার সময় হেডফোনটা নিয়ে গেলাম লাইনে দাঁড়িয়ে গান শুনবো বলে। এর আগেরবার বিল দিতে গিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল। কিন্তু আজ গিয়ে দেখি গ্যাসের বিল দেয়ার কাউন্টার ফাঁকা!
নিশ্চিত হতে ব্যাংকের এক লোককে জিজ্ঞেস করলাম গ্যাসের বিলের লাইন কোনটা। দেখিয়ে দিলো ফাঁকা কাউন্টারটাই। ![]()
![]()
এর আগে সেদিন ধানমণ্ডি যাবো একটা কাজে। শ্যামলির পর থেকে রাস্তা কাটা বলে প্রতিদিনই কলেজে যেতে প্রচুর সময় লাগে। তাই হেডফোনটা হাতে করে নিয়ে গেলাম। আজব ব্যাপার, রাস্তায় জ্যামই লাগলো না। ![]()
![]()
তারও আগের ঘটনা। কলেজে সেকেন্ড ইয়ারে ভর্তির টাকা জমা দিতে হবে। এক ক্লাসমেটের ফোনে ঘুম থেকে উঠে বেতন বই নিয়ে কলেজে দৌড় দিলাম। গিয়ে দেখি সামনে বিশাল লাইন। ঠিক লাইন বলা চলে না, বে-লাইন।
যে যেভাবে পারে বেতন বই জমা দিয়ে হিসাবরক্ষকের কাছ থেকে সাইন করিয়ে নিচ্ছে। সেদিন হেডফোন নেইনি বলে আফসোস করেছিলাম।
তার দুইদিন পর গেলাম কলেজ সংলগ্ন ব্যাংকে টাকা জমা দিতে। পরদিনই যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু ভিড় এড়ানোর জন্য একদিন বাদে গেলাম। অবশ্যই যাওয়ার সময় হেডফোনটা নিয়েছি কিনা তা ট্রিপল চেক করলাম। হুম, হেডফোন ইজ অ্যাবোর্ড। ![]()
কলেজে পৌঁছে দেখি ব্যাংকের সামনে কেউ নাই।
তখন বাজে পৌনে দশটা। ব্যাংক খুলবে ১০টায়। এখনো কেউ নাই মানে আমিই সবার আগে।
কী মুশকিল! হেডফোন নিলেই কি এর প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় নাকি?! ![]()
অবশ্য পরে কলেজের ভিতরের ব্যাংক কাউন্টারে গিয়ে দেখি বিশাল লাইন। যাক, এই প্রথম লাইন দেখে খুশি হলাম।
গিয়ে লাইনে দাঁড়ালাম। আমার সামনে একটা মেয়ে দাঁড়ানো ছিল। প্রথমে মনে হয়েছে কারো গার্ডিয়ান। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর একটা ছেলে পেছন থেকে এসে মেয়েটার সঙ্গে কথা বলে গেল। তখন জানলাম সে কারো গার্ডিয়ান না, আমাদের সাথেই পরে। বাসা মিরপুর। মিরপুরে বাসা শুনে আগ্রহী হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম মিরপুরের কোথায় বাসা। সে বললো ২ নাম্বার।
এখানে ক্লাসমেটকে কারো গার্ডিয়ান মনে করার পেছনে স্ট্রং একটা যুক্তি দেয়া উচিৎ।
আর সেটা হলো আমাদের কলেজের ইংলিশ মিডিয়াম ভার্সনের স্টুডেন্টদের বড়লোক মায়েরা যখন আমাদের সামনে দিয়েই আসা-যাওয়া করেন তখন আমরাই হিমশিম খেয়ে যাই। (কেন সেটা না বলাই বাহুল্য।
)
যাই হোক, ফিরে আসি ব্যাংকের লাইনের কথায়। কথায় কথায় জানতে পারলাম সে আর্টসে পরে আর তার ক্লাসরুম আমাদের ঠিক পরেরটাই । প্রায় টানা ২ মাস বন্ধের পর আরও ২০ দিন সামার ভ্যাকেশনের অপ্রয়োজনীয়তা নিয়ে বকবক করতে করে একসময় নিজেকে আবিষ্কার করলাম কাউন্টারের সামনে।
হেডফোনটার আর দরকার পড়লো না। ![]()
এখানে মাত্র তিনটা ঘটনা বলেই দেখছি পোস্ট বিশাল হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, হেডফোনের সঙ্গেও ভাগ্য জড়িত।
নইলে যখনই কোথাও দেরি হবে বা অপেক্ষা করতে হবে এই ভেবে হেডফোন নিলেই সেখানে কাজ দ্রুত হয়ে যাচ্ছে। যাই হোক, ভালোই হলো।
এখন আমি আমার হেডফোন ছাড়া চলাফেরা করি না। ![]()
![]()
![]()
এই লেখাটির প্রথম প্রকাশ ইংরেজি ব্লগেঃ A Headset Can Change Your Life (Sort of)