(পোস্টটি গতকাল লেখা হয়েছিলো। কিন্তু রাত অনেক হয়ে যাওয়ায় বাংলায় আর লেখার সময় পাইনি। ভালোই হলো এখন শান্তিতে লেখা যাবে। ইংরেজি ব্লগের বিদেশি পাঠকরা তো মানুষ মহাখালি সিগনাল আর জাহাঙ্গীর গেইট চিনবে না, তাই ওগুলো ওখানে লেখা হয়নি। এখানে বিস্তারিত লেখা যাবে।
)
১
কয়েক সপ্তাহের টানা অস্বাভাবিক গরমে মনে হচ্ছিল ফ্রিজে ঢুকে বসে থাকি। তাও গরমটা একটু সহ্য করা যেত যদি মাথার উপরে ফ্যানটা সারাদিন ঘুরতো। গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যেভাবে বিদ্যুৎঅলারা রাগ দেখানো শুরু করেছিলো, এতে আমরা সবাই যেন রীতিমতো কোনঠাসা হয়ে পড়েছিলাম।
বুধবার কলেজ শেষে অফিসে যাওয়ার কথা ছিল। মহাখালির বিডিনিউজ অফিসের কথা বলছি। কলেজ থেকে যেতে সর্বোচ্চ ১০ মিনিট লাগে। কিন্তু মাথার উপর এতো গরম নিয়ে এতোটুকু রাস্তা হাঁটার ধৈর্য্য হলো না। তাই লেগুনায় বসে বাসায় চলে এলাম। ভাবলাম, বিকেলের দিকে সূর্যের তাপ একটু কমলে আবার আসবো।
কিন্তু সূর্যের তাপ কমার তো কোনো লক্ষণই নেই। এদিকে অফিসে যাওয়াও দরকার ছিল। এদিকে অনেকদিন ধরে শখের সাইকেলটা পড়ে রয়েছে। নতুন সাইকেল চালানো শিখে যেটা টের পেয়েছি তা হলো নিয়মিত না চালালে অনেকদিন পর বের হলে সহজেই পা ব্যথা শুরু হয়। তাই বিকেল সাড়ে চারটার দিকে ঠিক করলাম যাই হোক অফিসে আজ যাবোই।
রাস্তায় বের হয়ে টের পেলাম কড়া রোদের মধ্যেও সুন্দর একটা বাতাস আছে যেটা বাসায় বসে টের পাওয়া যায় না। যদিও বাতাস খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। ঘেমেছি গোসলের মতো।
তবুও সাইকেল চালানোয় খুব একটা কষ্ট হয়নি। মিরপুর থেকে টেকনিক্যাল-শ্যামলী ঘুরে মহাখালী গেলাম ৪৫ মিনিটে। দূরত্ব ১০ কিলোমিটার। আমি অঙ্কে খুবই কাঁচা তাই এক ভাইয়াকে দিয়ে হিসেব কষালাম। ঘণ্টায় ১৩.৩ কিলোমিটার ছিল গড় গতি। খুব একটা খারাপ না। অবশ্য ওনাদের ২৫-৩০ কিমি/ঘণ্টার কথা শুনলে বড়ই নগণ্য মনে হয়।
যাই হোক, অফিসে পৌঁছে আর ভেতরে ঢুকলাম না। ঘেমে যেই অবস্থা হয়েছে, এই অবস্থায় অফিসে ঢুকলে সবাই ভাববে ইমার্জেন্সি। তাই একটা দোকান থেকে এক বোতল ঠাণ্ডা পানি নিয়ে মুখ ধোয়ার ব্যবস্থা করলাম। সাইকেল চালাতো কোনো কষ্ট হলো না। বাতাসও ছিল অনেক। প্রায়ই বাতাসের বেগে গতি ধীর করতে হচ্ছিল। এরপরও কেন এতো ঘামলাম বুঝলাম না। যাই হোক, অবশেষে ফুটপাথের পাশে লক করে অফিসের দিকে পা বাড়ালাম। মনে ভয়, যদি চুরি হয়।
অফিসে ঘণ্টাখানেক কাজ করলাম। গল্প-গুজব আর খাওয়া-দাওয়া শেষে সন্ধ্যার পর একজন এসে বললো বাইরে ভয়াবহ বৃষ্টি। শুরু হলো টেনশন। সাইকেলের জানি কী অবস্থা। চারতলার জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখলাম গুলশান যাবার রোডে পানি থৈ থৈ করছে। বুঝলাম, যেই সেই বৃষ্টি না। একেবারে ঝড়। তবে সাইকেলের অবস্থা দেখতে আর নিচে নামলাম না।
অবশেষে ৮.৩০ মিনিটে অফিস ছেড়ে বের হলাম। রাস্তায় তখনো হাঁটু পানি। বৃষ্টি পড়ছে অল্প অল্প। সেই সঙ্গে শোঁ শোঁ বাতাস। ভাগ্য ভালো ছিল, আমিও নেমেছি আর ঠিক আমার চোখের সামনেই বাতাসে সাইকেলটা মাটিতে পড়ে গেল। আগে পড়লে সমস্যা ছিল। সামনেই পড়লো, আধা মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যেই উঠিয়ে ফেললাম। B-)
তারপর একটু এগিয়ে আরও কয়েকজনের সঙ্গে হাঁটতে শুরু করতে না করতেই শুরু হলো ঝুম বৃষ্টি। কী আর করা, একটা এটিএম বুথের সামনে আশ্রয় নিলাম। প্রায় দশ মিনিট অপেক্ষা করলাম বৃষ্টি কমে কি না দেখার জন্য। শেষে কমার কোনো লক্ষণ না দেখে যা থাকে কপালে ভেবে সাইকেলে চেপে বসলাম।
বলা বাহুল্য, এর আগে আমি বৃষ্টি হলে রাস্তাঘাট শুকানোর আগ পর্যন্ত সাইকেল নিয়ে বের হইনি। ভয় ছিল পিছলে যাবো।
কিন্তু সেদিন বাধ্য হয়েই সাইকেলে কেবল ভেজা রাস্তায় নয়, বরং নিচে হাঁটুপানি আর উপরে ঝুম বৃষ্টি সেই সঙ্গে টানা বিদ্যুৎ চমকানো মাথায় নিয়ে সাইকেল চালানোর ঘটনা তো ছিল কল্পনাতীত।
যাই হোক, সাহস করে আস্তে আস্তে চালাতে থাকলাম। দেখলাম ভালোই তো পারি।
তাই একটা মোটামুটি স্পিডে চালাতে থাকলাম। রেলগেটে এসে সিগন্যালে পড়লাম। জায়গাটা খোলা বলে বাতাসও খুব গায়ে লাগছিল। কেঁপে উঠলাম কয়েকবার। ভয় হলো, এভাবে কাঁপতে থাকলে যে কোনো সময় নিয়ন্ত্রণ হারানো খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। আর বৃষ্টিতে গাড়িচালকরা যেন আরও পাগল হয়ে গাড়ি চালায়। খুব জোরে বৃষ্টি হচ্ছিল বলে একটু দূরের জিনিসও তেমন দেখা যাচ্ছিল না।
আর সবচেয়ে বিপদের ব্যাপার হলো, আমার চশমা ভিজে ঘোলাটে হয়ে গেছিল পুরোপুরি। তাই ঠিক করলাম, আর চালানো সম্ভব নয়। অন্তত সিগনাল ক্রসিং এর সময় তো নয়ই।
নেমে গেলাম সাইকেল থেকে।

২.
শুরু হলো সাইকেল ঠেলে এগোনো। বৃষ্টির মধ্যে ভিজতে ভিজতে সাইকেল নিয়ে হাঁটার অভিজ্ঞতাও একেবারে খারাপ নয়। এক পাশে ছিল সিএনজি স্টেশনে লাইনে দাঁড়ানো গাড়ি, আরেকপাশে ছুটে চলা গাড়ি। মানুষজন সব বন্ধ দোকানের শাটারের সঙ্গে সেঁটে দাঁড়ানো, আর আমি হাঁটছি সাইকেল ঠেলে। তবে বেশিক্ষণ এভাবে চালাতে ইচ্ছে হলো না। বৃষ্টি একটু কমে এলে আবার শুরু করলাম অ্যাডভেঞ্চার। তখন ভাবছিলাম ক্যান্টনমেন্ট দিয়ে যাবো নাকি। কিন্তু মিরপুর ১৪ থেকে ১০ নম্বরের ভাঙা রাস্তার কথা ভেবে সেই চিন্তা বাদ দিলাম।
জাহাঙ্গীর গেইট ঘুরে সোজা বিজয় স্মরণীর দিকে চালাতে থাকলাম। পুরোটা সময় মাথায় ছিল বৃষ্টি। তবে খোলা রাস্তায় খুব একটা ভয় হচ্ছিল না। ভয় হচ্ছিল যখনই সিগনালের ধারে কাছে পৌঁছছিলাম। তবে শেষ পর্যন্ত নিরাপদেই বিজয় স্মরণীর সব সিগনাল পার হয়ে রোকেয়া স্মরণীতে এসে পৌঁছলাম। সেখানেও অবশ্য আগারগাঁও-এ বিশাল জ্যাম আর হাঁটুপানিতে পড়েছিলাম।
এই ধরনের মূহুর্তগুলো খুবই রেয়ার। আপনি হয়তো বৃষ্টির মধ্যে সাইকেল চালিয়ে থাকবেন। কিন্তু জীবনের প্রথমবার ঝড়ো হাওয়া, তুমুল বৃষ্টি, ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকানো আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার, রাস্তায় জমে যাওয়া হাঁটু পানির মধ্যে সাইকেল চালানোর অভিজ্ঞতা সত্যিই বাকি জীবন মনে রাখার মতো।
এই ধরনের মূহুর্তগুলো খুবই রেয়ার। আপনি হয়তো বৃষ্টির মধ্যে সাইকেল চালিয়ে থাকবেন। কিন্তু জীবনের প্রথমবার ঝড়ো হাওয়া, তুমুল বৃষ্টি, ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকানো আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার, রাস্তায় জমে যাওয়া হাঁটু পানির মধ্যে সাইকেল চালানোর অভিজ্ঞতা সত্যিই বাকি জীবন মনে রাখার মতো। প্রথমবারের মতো একইসঙ্গে রাতে, বৃষ্টির সময় ও পানি জমে যাওয়া রাস্তায় সাইকেল চালানোর সময় নিরাপদ থাকতে সাহায্য করেছে তিনটি বিষয়ঃ সামনে কী আছে, পেছন থেকে কী আসছে, আর গতি স্বাভাবিক রাখা।
সাইকেল?
অনেকে এখনো বাইসাইকেলকে গরীবী জিনিস মনে করেন। অনেকের আবার সাইকেলে প্রেস্টিজেও লাগে। কিন্তু সাইকেল চালানো সত্যিই মজার যদি উপভোগ করার মতো মন-মানসিকতা থাকে। এছাড়াও গুগলের মতো কোম্পানিও কর্মীদের সাইকেল চালাতে উৎসাহী করে। আর সাইকেল চালানোর সময় অবশ্যই প্রটেক্টিভ গিয়ার (হেলমেট, নি-এলবো গার্ড ইত্যাদি) রাখা উচিৎ। এতে নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি রাস্তার অন্য গাড়িচালকরাও বুঝবেন আপনার সাথে ফাজলামো করা যাবে না।
সবশেষে, দৈনন্দিন জীবনে সাইকেল চালাতে ইচ্ছে না করলেও মাঝে মাঝে অথবা সপ্তাহান্তে সাইকেল নিয়ে ঢাকার আশেপাশে ঘুরে আসতে পারেন। বাংলাদেশে থাকলে বিডিসাইক্লিস্ট নামের একটি গ্রুপে জয়েন করতে পারে যারা প্রতি শুক্র-শনিবার রাইডের আয়োজন করে। উল্লেখ্য, তাদের কাছ থেকেই সাইকেল চালানোর হাতেখড়ি পেয়েছি।
ঐচ্ছিকঃ
আমার সাইকেলের ছবি