
(পর্ব ১১)
২৫
আজও কলেজ প্রায় ফাঁকা। সকাল থেকে এক নাগাড়ে বৃষ্টি হওয়ায় দূর-দূরান্ত থেকে অনেকেই আসতে পারেনি। সেই সুযোগে যাদের বাসা কাছেই তারাও ফাঁকি দিতে মিস করেনি। কিন্তু সাইফ আজ ঠিকই এসেছে। সে অনেক ভালো ছাত্র তাই বলে নয়, সে যখন বেরিয়েছে তখন বৃষ্টি থেমেছিল। তাই ইচ্ছে থাকলেও কলেজে যাওয়া বাদ দিতে পারেনি।
কলেজে এসে দেখে তার ক্লাসরুমে মাত্র দশজন আছে। তাদের মধ্যে অনিকও ছিল। অনিক ছেলেটা বেশ প্রাণচঞ্চল। শারমিন নামের একটা মেয়ের সঙ্গে ওর রিলেশন আছে আজ প্রায় তিন বছরেরও বেশি হয়েছে। এতো দীর্ঘ সময় রিলেশন ধরে রাখা কঠিন। ওদের মাঝে অনেকবার ব্রেকআপ হওয়ার কথা শুনেছে সাইফ। কিন্তু প্রতিবারই সব ঠিক করে নেয় অনিক। ব্যক্তিগতভাবে অনিক খুব ফাস্ট। কথা দিয়ে মানুষকে ভোলাতে তার এক মিনিট সময়ও লাগে না। বিশেষ করে মার্কেটিং-এর কাজে ওকে লাগালে ও বেশ ভালো করতে পারবে বলে সাইফের বিশ্বাস। এসব মানুষই হয়তো রিলেশন টিকিয়ে রাখতে পারে। রিলেশন টিকিয়ে রাখতে কেবল ভালোবাসা আর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশই যথেষ্ট না। ভুলিয়ে-ভালিয়েও রাখতে হয়, যেটাকে শুদ্ধ বাংলায় পটানো বলে!
আনমনেই হাসলো সাইফ। মাঝের দিকে একটা বেঞ্চে গিয়ে বসলো। ওকে দেখেই অনিক আসলো। পাশে এসে বসে বলল, ‘তোমার কী হয়েছে বলো তো?’
‘কই কী হয়েছে?’
‘আমি যতদূর ধারণা করেছিলাম সিনথিয়ার সঙ্গে রিলেশন আছে বা হবে। কিন্তু তোমাদের ব্যাপারটা আমি ঠিক বুঝতেসি না। একটু বলো তো ঘটনা কী?’
‘ঘটনা কিছুই না। সিনথিয়ার সঙ্গে আমার কোনো রিলেশন নেই, হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। কারণ, আমি আরেকটা মেয়েকে পছন্দ করি। যদিও সেই মেয়েটা আমাকে আর পছন্দ করে না।’
অন্য দিকে তাকিয়ে মাথা ঝাঁকালো অনিক, ‘হুম, আর পছন্দ করে না। মানে একসময় করতো। কী হয়েছিল?’
‘সে অনেক কথা।’
‘শর্টকাট বলো।’
‘শর্টকাটে বলা যাবে না। কারণ, কী হয়েছিল তা আমি নিজেও জানি না। হয়তো দুই ধরনের লাইফস্টাইল থেকে আসা, দুই ধরনের পরিবার থেকে আসা দুইটা মানুষের মধ্যে স্থায়ীভাবে মিল কখনোই হয় না।’
অনিক বেশ চালাক ছেলে। ও সবটা না বুঝলেও এতটুকু কথা থেকেই অনেক কিছু বুঝে নিল। বলল, ‘দোস্ত, যা গেছে তো গেছে। এটা নিয়ে এতো মন খারাপের কী আছে? আমাদের সবার লাইফেই এমন হয়। গেট ইউজড টু ইট। তোমার লাইফেও দেখবে আরও অনেক মেয়ে আসবে, যাবে। ইভেন এখনই দেখো সিনথিয়া তোমার লাইফের অনেক কাছাকাছিই আছে। আমার তো পুরো বিশ্বাস তুমি সিনথিয়াকে সুন্দর দেখে একটা সময়ে প্রোপোজ করলে ও একবাক্যে রাজি হয়ে যাবে।’
সাইফ কেবল মাথা নাড়লো। সিনথিয়ার প্রোপোজ করার কথাটা বললো না অনিককে। ‘হয়তো আসবে, কিন্তু আমি আর কাউকে আপন করে নিবো না, কিংবা নিতে পারবো না।’
‘না পারার কী আছে?’
‘তুমি বুঝবে না। আর তোমাকে বোঝানো সম্ভবও নয়। এই পুরো ব্যাপারটাই একটু ভিন্ন। তাই বাদ দেও।’
অনিক বুঝলো আর কিছু বলে লাভ হবে না। সে কেবল সাইফের কাঁধ চাপড়ে দিয়ে বলল, ‘থিংক অ্যাবাউট সিনথিয়া। ও বেশ ভালো একটা মেয়ে।’
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সাইফ। অনিক উঠে সামনের দিকে চলে গেল। সাইফ তাকালো বাইরের দিকে। সিনথিয়াকে দেখতে পেলো। ছাতা বন্ধ করতে করতে বারান্দা দিয়ে দরজার দিকে এগোচ্ছে।
সিনথিয়া এসে সাইফের দিকে তাকিয়ে একবার হাত নাড়লো কেবল। আর কিছু বললো না। সাইফের একটু মনে হলো ওর কোনো কারণে মন খারাপ। কিন্তু এটা নিয়ে মাথা ঘামালো না বেশি। ক্লাস শুরু হচ্ছে, ক্লাসে মন দেয়ার চেষ্টা করলো।
২৬
টিফিনে ক্যান্টিন থেকে দু’বোতল কোক নিয়ে বারান্দার সেই বেঞ্চে বসলো সাইফ আর সিনথিয়া। উপস্থিতি কম তাই কোলাহলও নেই। বৃষ্টি থামার পর থেকেই কী একটা পাখি যেন উপর থেকে এক নাগাড়ে ডেকে চলেছে। সাইফ অনেকক্ষণ ধরেই পাখিটাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। আর সিনথিয়া খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে কী বলে সাইফের সঙ্গে কথা বলা শুরু করবে।
‘সিমির কথা তোমার অনেক মনে পড়ে তাই না?’ অবশেষে বলল সিনথিয়া।
‘ওর কথা আমার মনে পড়ে না, মনেই থাকে সবসময়,’ অনেকটা দায়সারা ভঙ্গিতে জবাব দিলো সাইফ।
‘ও তোমাকে কেন ছেড়ে গেল? আই মিন, সমস্যা তো হয়ই। এটা সহ্য না করার মতো রিলেশন তো তোমাদেরটা ছিল না।’
‘জানি না। ওর আর আমার ব্যাকগ্রাউন্ড হচ্ছে অনেকটা সাদা আর কালোর মতো। একটা থেকে আরেকটার পার্থক্য এতোটাই উজ্জ্বল আর ব্যতিক্রম।’
‘ব্যাকগ্রাউন্ড?’ সিনথিয়ার প্রশ্ন।
‘ওর কাছে মাঝে মাঝে অনেক কথা শুনতাম ওর ছোটবেলা সম্পর্কে। ওর ফ্যামিলিতেও প্রবলেম ছিল। কিন্তু ও যথেষ্ট ভালোও ছিল। যেমন ধরো ওর এমন স্মৃতি আছে যে ও অনেক ঘুরে বেড়িয়েছে। দেশের বাইরে বেরিয়েছে। একটা সময় ছিল যখন ও আশেপাশের বন্ধু-বান্ধবীদের সঙ্গে রাতদুপুরে ছাদে খোলা আকাশের নিচে বসে তারা দেখেছে। মজা করেছে। এমনকি কোথাও না গেলেও ওর আত্মীয়রা বাসায় আসলে গল্প করেছে, বাসার মানুষদের সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছে। এগুলোর সবই একটা মানুষের লাইফে খুব সাধারণ কিছু ব্যাপার।’
সিনথিয়া চুপ করে রইলো। এগুলোর মধ্যে অনেক স্মৃতি তার জীবনেও আছে।
সাইফ বলতে থাকলো, ‘কিন্তু যখন আমার মতো কোনো ছেলের সঙ্গে তুলনা করবে, তখন এই সাধারণ ব্যাপারগুলোই হয়ে উঠবে যেন স্বর্গীয় আনন্দ। বন্ধুদের সঙ্গে ছাদে রাতে থাকার আনন্দ কী জিনিস আমি জানি না। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ানো কাকে বলে আমি জানি না। বাসায় আত্মীয়-স্বজনেরা আসবে, অনেক বন্ধু-বান্ধব থাকবে, মজা করবো, বাইরে যাবো, এসব কী জিনিস আমি জানি না। সবচেয়ে মজার ব্যাপার কী জানো? কোনোদিন জানবোও না। হয়তো একদিন আয় করবো অনেক। জীবনে উন্নতি আসবে। কিন্তু সেই বয়সটা তো আর আসবে না। ছোটবেলার এসব স্মৃতি যাদের আছে তাদের যেমন সারাজীবনই থাকবে, যাদের নেই তাদের তেমনি সারাজীবনই শূন্যই থাকবে।’
সিনথিয়া তখনও চুপ করে রইলো। সে নিজেও কখনো বিষয়গুলো এভাবে ভাবেনি। প্রথমবারের মতো নিজের জীবনকে নিয়ে নিজেকে সুখী মনে হলো তার। তার চেয়েও খারাপ অবস্থায়ও তো মানুষ থাকে।
‘সিমি আমার লাইফে আসার পর এর সবই আমি ভুলে গেছিলাম। আমার মনে হয়েছিল, জীবনে এসব হয়তো যে কোনো বড়লোকের সন্তানই পায়, কিন্তু লাইফে একজন সিমি সবার ভাগ্যে জোটে না। এই চিন্তাটা নিজে নিজেই আমার দুঃখ ভুলিয়ে দিয়েছিল। আমি সিমিকে এতোটাই ভালোবেসেছি যে আমি সারাজীবন ওকে এমনভাবেই আগলে রাখতাম যে কোন শীতকালে যদি দমকা হাওয়া আসে ওকে কাঁপিয়ে দিতে, তাহলে ওর আগে সেই হাওয়া আমার গায়ে লাগাতাম।’
সিনথিয়া তখনও চুপ। তবে ওর কেন যেন কান্না পাচ্ছে। ছবি দেখে মানুষ যেমন অনেক আবেগপ্রবণ হয়ে উঠে, সাইফের মুখে ওর নিজের কথাগুলো শুনে সিনথিয়ার যেন অনেকটা তেমনই অনুভূতি হচ্ছে।
সাইফ উঠে দাঁড়ালো। টিফিন টাইম প্রায় শেষ। সিনথিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমি সিমিকে আজও অনেক অনেক ভালোবাসি, সিনথি। দে সে, টাইম হিলস এভরিথিং। বাট দে ডিডন’ট হ্যাভ এ লাইফ লাইক মাইন।’
কথাটা যেন গায়ে বিঁধলো সিনথিয়ার। ওর মনে হলো, ওকে যে সাইফ অ্যাক্সেপ্ট করছে না এটাই বুঝিয়ে দিয়ে গেল আরেকবার।
২৭
ছুটির পর সাইফকে নিচে গিয়ে দাঁড়াতে বলল সিনথিয়া। সিনথিয়া বইপত্র গোছগাছ করে ধীরেসুস্থে নিচে নেমে এলো। কীভাবে কী বলবে বোধহয় তাই মনে মনে ঠিক করে নিল। সাইফের পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে বলল, ‘গতকাল আব্বু একটা কথা জানালো।’
‘কী কথা?’
‘আমি আর আব্বু আগামী সপ্তাহে আমেরিকা যাচ্ছি।’
‘হুম। কোনো কাজে? নাকি এমনি ঘুরতে?’
‘একেবারে।’
‘সরি?’ সাইফ যেন বুঝতে পারলো না।
‘আব্বু চায় আমি বাইরে লেখাপড়া করি। বাংলাদেশের এডুকেশন সিস্টেম আমার তো নাই আব্বুরও পছন্দ নয়। আমার তো অনেকদিন ধরেই ইচ্ছে ছিল যে বাংলাদেশ ছাড়বো। তুমিও তো বলতে বাংলাদেশ ছাড়তে পারলে ছাড়াই উচিৎ। এখন আব্বু ঠিক করেছে আমি আর আব্বু আমেরিকা চলে যাবো। আম্মু আর আপু হয়তো পরে আসবে।’
সাইফ মাথা ঝাঁকালো। কী বলবে বুঝতে পারছে না।
সিনথিয়া বলল, ‘তবে আমার কাছে অপশন আছে এটা ক্যানসেল করার। আই মিন, আমি যদি যেতে না চাই আমাকে জোর করা হবে না। পছন্দ আমার। আমি সবসময় বিদেশে লেখাপড়া করতে চাইলেও এই প্রথম আমার দেশ ছাড়তে ইচ্ছে করছে না। কেন জানো সাইফ?’
‘কেন?’ সাইফ জিজ্ঞেস করলো।
‘কারণ, আমি তোমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখি,’ অনেকটা যেন সকালের কথা ভুলে গেছে এমনভাবে বলল সিনথিয়া। ‘যদি তোমাকে পাওয়ার বিন্দুমাত্র আশা থাকে, আমি থেকে যাবো। আর যদি কোনোদিনই না পাই, তাহলে আমি চলে যাবো। তোমাকে আর বিরক্ত করবো না।’
সাইফ চুপ করে রইলো। এমন একটা ঝামেলায় পড়বে ভাবতে পারেনি।
সিনথিয়া বলল, ‘তুমি চিন্তা করে তাড়াতাড়ি আমাকে জানাও। তোমার ডিসিশনের উপরে আমার ফিউচার, সাইফ। আর আরেকটা কথা কি জানো? আই স্টিল লাভ ইউ।’
সিনথিয়া আর দাঁড়ালো না। কনফিউজড হয়ে যাওয়া সাইফকে পেছনে রেখে হেঁটে গেট দিয়ে বের হয়ে গেল সিনথিয়া। একবার পেছন ফিরে তাকালোও না।
আর এদিকে সাইফ তখন নতুন দোটানায়। বন্ধু হিসেবে সিনথিয়া সত্যিই ভালো। ওকে হারালে একটু খারাপ আর একাকী লাগবেই। কিন্তু তাই বলে ওকে নিজের লাইফে টানতেও পারছে না সে। সিমির জায়গা সে আর কাউকে দেবে না। হয়তো সিমি তার জায়গায় দ্রুতই অন্য কাউকে দিয়ে দেবে। কিন্তু তার ভালোবাসা ছিল অনেক বেশি গাঢ়, সে সিমির জায়গা আর কাউকে দেবে না।
কিন্তু তবুও তার মনে কনফিউশন রয়েই যায়।
(চলবে)


Pingback: গল্পঃ My Best Friend Simi (শেষ পর্ব) | আমিনুল ইসলাম সজীবের বাংলা ব্লগ
সজীব, তোমার মধ্যে সুপার ট্যালেন্টএর পাশাপাশি ডিটারমিনেশন খুব বেশী যেটা তোমার জেনারেশনে পাওয়া আমাদের জন্য ভাগ্যের ব্যপার।তোমারএ কোয়ালিটিকে ভীষন অর্গানাইজড ভাবে ব্যবহার করতে পারলে…
আমার মনে হয় কি জানো’প্রেম /ভালোবাসার ‘ গল্প লেখার জন্য তোমার ম্যচিওরিটিএখনো আসেনি.এটা বোধহয়এখনো তোমার এরিয়া হয়ে ওঠেনি। তবে লেকার প্রকত ভালবাসা যদি তোমার থাকে সেটা তোমাকে লক্ষ্যে পৌছে দেবে।
শুভকামনা রইলো।