
(পর্ব ৯)
২১
কলেজ ছুটি হয়ে গেছে। নির্ধারিত সময়ের ঘণ্টাখানেক আগেই ছুটি হয়ে যাওয়ায় অনেকেই কলেজের মাঠে ঘোরাফেরা করছে। উপস্থিতিও কম, স্যাররাও কিছু বলছেন না তাই বেশ চুটিয়ে মজা করছে সবাই। আর একটু দূরে কলেজ বিল্ডিং-এর বারান্দায় রাখা বেঞ্চে বসে তাদের মজা করার দিকে তাকিয়ে আছে সাইফ। পাশে তার সিনথিয়া। সিনথিয়া ঠিক করেছে এখনই বাসায় যাবে না। এই ছেলেগুলো যতক্ষণ আছে ততক্ষণ থাকবে। সাইফের কথা শুনবে।
আকাশ তখন মেঘাচ্ছন্ন। বৃষ্টি আবারো নামবে নামবে করছে। সিনথিয়া সাইফকে বলল, ‘আবহাওয়াটা কেমন না? আনপ্রেডিক্টেবল।’
‘হুম,’ আনমনে জবাব দিলো সাইফ। ‘এমন আবহাওয়া অনেক পুরনো স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়।’
‘কী রকম? সিমির কথা?’
‘হ্যাঁ। ও আমার জীবনে তুলনামূলকভাবে খুব ছোট্ট একটা সময়ের জন্য ছিল। কিন্তু এই সময়েই সে আমার মধ্যে তার একটা রাজ্য তৈরি করে দিয়ে গেছে। সেই রাজ্যে নেই এমন প্রায় কিছুই নেই।’
‘তাই? কী রকম বলো তো শুনি,’ সিনথিয়ার কণ্ঠে আগ্রহ।
‘এই যেমন ধরো আবহাওয়ার কথা। এমন কোনো আবহাওয়া নেই যখন আমি ওর সঙ্গে ছিলাম না। এই যে এখন যেই আবহাওয়া, এই আবহাওয়ায় আমি ওর সঙ্গে ঘুরেছি। খুব বেশি সময় না, তবে ঘুরেছি। বিভিন্ন জায়গায় বাসের জন্য দাঁড়িয়ে থেকেছি। ওর বৃষ্টিতে ভেজা খুবই পছন্দ ছিল। কিন্তু ঠাণ্ডা লেগে যাবে এই ভয়ে আমি আমার ব্যাগ ওর মাথার উপরে ধরতাম। সঙ্গে সঙ্গে ওর মনটা খারাপ হয়ে যেত। ব্যাগটা সরালেই ফিরে আসতো দীপ্তিময় হাসি। আমি দেখে খুব মজা পেতাম। ও রীতিমতো কাকুতি-মিনতি করতো ভেজার জন্য। অবশ্য তেমন কাকভেজা আমরা মাত্র একবার ভিজেছি।’
সিনথিয়া জিজ্ঞেস করলো, ‘আর?’
‘আর ধরো বৃষ্টি হচ্ছে এমন আবহাওয়া। এমন আবহাওয়ায় ওর সঙ্গে অনেক কথা বলেছি। বৃষ্টি শুরু হলেই ওর কথা মনে পড়তো। ওকে ফোন করতাম বা ও আমাকে ফোন করতো। বৃষ্টির সময়গুলোতে আমরা দু’জনেই খুব আবেগঘন হয়ে যেতাম। যেন ছাদের নিচে বসেও বৃষ্টি আমাদের দু’জনের হৃদয় ছুঁয়ে যেত। সেই মুহুর্তগুলো আমি আজও খুব ফিল করি।’
‘হুম।’
‘তারপর মনে করো প্রখর রোদের কথা, যেটা বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। আমার রোদ ভীষণ অপছন্দ। রোদ উঠেছে দেখলেই মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। কিন্তু এখন রোদ আমার মেজাজ খারাপ করে না। এখন রোদ আমাকে মনে করায় অনেক সুখের সব স্মৃতি।’
‘কী স্মৃতি?’ সিনথিয়ার প্রশ্ন।
‘আমি আর সিমি যতটুকু সময় বাইরে ঘুরেছি, তার নাইনটি পার্সেন্টই ছিল তপ্ত রোদের মধ্যে। এতো রোদ আগে আমার খুব অসহ্য লাগতো। কিন্তু বিশ্বাস করবে না, সিমি সাথে থাকলে রোদ যত কড়াই হোক না কেন, আমার যেন গায়েই লাগতো না। দরদর করে ঘামতাম। সিমিও খুব ঘামতো। আমরা হাঁটার সময় হাত ধরে হাঁটতাম। রিকশায় বসলে ওর কাঁধে হাত দিয়ে আমার দিকে টেনে রাখতাম। বাসেও এভাবে আমার দিকে ঝুঁকে থাকতো সিমি। যার কারণে আমরা দু’জনের ঘামে নিজেরা একাকার হয়ে যেতাম। একদিন সিমি প্রায় এক ঘণ্টা টানা আমার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়েছে বাসে। এতো গরমে ঘামতে ঘামতে কীভাবে ঘুমালো ঠিক বুঝিনি। কিন্তু আমার খুব ভালো লেগেছিল। ওকে জড়িয়ে রেখেছিলাম, আর বারবারই ওর মুখের দিকে তাকাচ্ছিলাম। খুব ভালো লাগছিল আমার সিমিটার দিকে তাকাতে।’
হাসলো সিনথিয়া। ব্যাপারটা তার কাছে ছেলেমানুষীও মনে হচ্ছে, আবার খুব সুইটও মনে হচ্ছে।
সাইফ বলে চলল, ‘ওর কপাল বা নাক যখন খুব ঘেমে যেত, তখন ও কী করতো জানো?’
‘কী?’
‘আমার কাঁধে সেটা মুছতো। মুছে আবার আমার দিকে বাচ্চা মানুষের মতো একটা ভাব করে তাকিয়ে থাকতো। ওর সেই দৃষ্টিটা আমার এতো ভালো লাগতো; বোঝাতে পারবো না। আবার আমি ঘামলে আমার কপাল বা ঘাড় থেকে ঘাম নিয়ে ওর জামায় মুছতো। বলতো, আমার চিহ্ন নাকি রেখে দিচ্ছে ওর কাপড়ে। যাতে বাসায় গিয়েও আমাকে দেখতে পারে। আমার খুব হাসি আসতো। ভালোও লাগতো, ওর এতো সুন্দর ভালোবাসা দেখে নিজেকে সবচেয়ে সুখী আর ভাগ্যবান মনে হতো।’
সিনথিয়া চুপ করে রইলো। তবে ওর মুখটা হাসি হাসি ভাব করে রেখেছে। এগুলো শুনতে সত্যিই ওর ভালো লাগছে। কিছুক্ষণের জন্য যেন নিজের না পাওয়াগুলো ও ভুলে গেছে।
২২
‘সিমিকে আমি অনেক ভালোবাসি। ওর আর আমার মধ্যে একটা মিল ছিল এই যে, আমরা কেন যেন একজন আরেকজনকে বয়ফ্রেন্ড বা গার্লফ্রেন্ড ভাবতে পারতাম না। শব্দগুলো কেন যেন এই যুগের সাময়িক সঙ্গীর প্রতিশব্দ বলে মনে হতো। মনে হতো, বয়ফ্রেন্ড বা গার্লফ্রেন্ড হলেই একদিন সে চলে যাবে। তাই আমরা একজন আরেকজনকে অনেক আপন বলেই ভাবতাম। আর সেভাবেই ফিল করতাম দু’জন দু’জনের জন্য।’
‘কী রকম আপন?’ বুঝেও না বোঝার ভান করে জিজ্ঞেস করলো সিনথিয়া। তার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসি দেখতে পেলো সাইফ। সাইফও একটু হেসে বললো, ‘এই তো…লাইক..হাজব্যান্ড-ওয়াইফ।’
সিনথিয়া হাসতে শুরু করলো। সাইফের কথা শুনে নয়, সাইফকে লজ্জা পেতে দেখে। এই প্রথম সে সাইফকে লজ্জা পেতে দেখলো। ছেলেটার মাঝে সবরকম অনুভূতিই আছে। ইচ্ছে করে ও সব যেন চেপে রেখে দেয়।
সাইফ বলতে থাকলো, ‘আমি নানা কারণে খুব চুপচাপ অবস্থায় বড় হয়েছি। ছোটবেলা থেকেই একদম চুপচাপ ও ঠাণ্ডা স্বভাবের ছিলাম। বড় হতে হতে পারিবারিক ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে সেই চুপচাপ ভাবটাও আমার সঙ্গে সঙ্গেই বড় হয়েছে। আমি কথা বলায় কখনো পটু ছিলাম না। কারো সঙ্গে মিশতে পারতাম না। কিছু ক্লাসমেট ছিল বটে, যাদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতাম। কিন্তু প্রতিটা মানুষেরই কিছু একান্ত কথা থাকে যেগুলো সে হয়তো কোনো বেস্ট ফ্রেন্ড বা ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে শেয়ার করে। আমার ক্ষেত্রে সিমিই হয়ে উঠেছিল সেই বেস্ট ফ্রেন্ড। আর আমাদের সম্পর্কের সবচেয়ে ভালো দিক ছিল এই যে, শেষ পর্যন্ত আমরা দু’জনই দু’জনের বেস্ট ফ্রেন্ডই ছিলাম।’
একটু থামলো সাইফ। তারপর আস্তে আস্তে বলল, ‘জানি না কেন এখন ও আমাকে এভাবে দূরে ঠেলে দিলো।’
সিনথিয়া ভাবতে লাগলো কীভাবে প্রসঙ্গ ঘুরানো যায়। এমন দিনে সিমির সঙ্গে কীভাবে ব্রেকআপ হলো সেই মন খারাপ করা কথা শুনতে সিনথিয়ার আর ইচ্ছে করছে না। সে তাড়াতাড়ি জিজ্ঞেস করলো, ‘সিমির আর কী কী কথা তোমার অনেক মনে পড়ে?’
সাইফ বলল, ‘অনেক কিছুই মনে পড়ে। ওর সঙ্গে আমার এতো বেশি স্মৃতি জড়িয়ে গেছে যে, ২৪ ঘণ্টার ২৪ ঘণ্টাই ওর স্মৃতি জড়িয়ে আছে। তবে ইদানীং একটা স্মরণীয় মূহুর্তের কথা খুব বেশি মনে পড়ে।’
‘কী সেটা?’
‘আমার পায়েল খুব পছন্দ। কেন জানি না, কিন্তু পায়েল আমার ভালো লাগে। শব্দ করতে হবে এমন কোনো কথা নেই, পায়েল হলেই চলবে। আর এই কথাটা সিমি জানতো। তাই ও একদিন কোত্থেকে যেন একটা পায়েল জোগাড় করে রেখে দিল। আমি কী একটা কারণে যেন ওর বাসায় গেলাম, তখন ও পায়েলটা বের করে আনলো। আমাকে বলল পরিয়ে দিতে।’
‘তাই?’
‘হ্যাঁ, ঐ সময়টা খুব রোমান্টিকতায় ভরা ছিল। আর সিমির ছিল চরম লজ্জা। আমাকে পরিয়ে দিতে বলে নিজেই লজ্জায় যেন নেই হয়ে গেল।’
‘তারপর কি তুমি পরিয়ে দিলে?’
‘হ্যাঁ, ও খাটে বসেছিল। আমি চেয়ার থেকে উঠে ওর সামনে মাটিতে বসলাম। ও তখন পারলে পা খাটের নিচে ঢুকিয়ে বসে থাকে। আমি প্রায় জোরাজুরি করেই ওর পা আমার হাঁটুর উপরে রাখলাম। তারপর পায়েলটা পরিয়ে দিলাম তাড়াহুড়ো করে।’
‘তাড়াহুড়ো করে কেন?’
‘কারণ কেউ দেখে ফেলার ভয় ছিল। তবে তাড়াহুড়োর ফলও খারাপ ছিল। পায়েলটা উল্টো করে পরিয়ে ফেলেছিলাম। অবশ্য আমার দোষ না, আমি তো আর জানি না মেয়েদের এসব কীভাবে পরতে হয়।’
সিনথিয়া হাসতে থাকলো। ‘আহারে! বেচারি সিমির নিশ্চয়ই মন খারাপ হয়েছিল?’
‘একটুও না। ও নিজে আবার ঠিক করে নিয়েছিল। মন খারাপ হয়েছিল আমার। আমিই পরাতে গিয়ে উল্টো করে ফেলেছিলাম।’
‘তারপর থেকে ও নিশ্চয়ই পায়েল পরতো সবসময়?’
‘হ্যাঁ। আর ও নাকি কেবলই পায়েলটা দেখতো আর মনে মনে ভাবতো, আমি অনেক আদর করে ওকে এটা পরিয়ে দিয়েছি। আমার অবশ্য একটা দুঃখ ছিল যে, পায়েলটা আমি কিনে দিতে পারিনি। তখন হাতে একদমই টাকা ছিল না।’
‘হুম।’ সিনথিয়া তখন মাঠের দিকে তাকিয়ে আছে। কিছুটা যেন আনমনেই বলল, ‘তুমি সিমিকে অনেক আদর করতে তাই না?’
কথাটার জবাব না দিয়ে সিনথিয়ার দিকে তাকালো সাইফ। আর তখনই যেন সিনথিয়া বুঝতে পারলো, কথাটা অন্য অর্থও দাঁড়াতে পারে। সে বলল, ‘আই মিন, ওকে অনেক জড়িয়ে ধরে রাখা, সারাক্ষণ হাত ধরে রাখা, কাছে থাকলে হাত ধরে রাখা, এইসব।’
সাইফ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সেও তার দৃষ্টি অনেক দূরে ফেলে বলল, ‘হ্যাঁ, ও আমার কাছে খুবই প্রিয় একটা মানুষ। ওকে আমার পরীর মতো মনে হয়। সাধারণ কোনো পরী না, কেবল আমার জন্য পাঠানো পরী। যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমার সব অনুভূতি, যার একটু হাসির মধ্যে ছিল আমার অসীম আনন্দ, যার একটু স্পর্শের মধ্যে ছিল আমার অনেক প্রাপ্তি। আর সবচেয়ে ভালো লাগতো এটা যে ওর হাত ধরলে, ওর কাঁধে হাত রাখলে আমার এইসব সাধারণ স্পর্শগুলোও ও এতো বেশি ফিল করতো, দেখেই বোঝা যেত যে এগুলো যেন ওর মন ভরিয়ে দিচ্ছে। ওর চোখেই দেখতে পেতাম আমার প্রতি ওর ভালোবাসা।’
সিনথিয়া চুপ করে রইলো। এখন কী বলা উচিৎ যে ঠিক ভেবে পাচ্ছে না। তাই দু’জনেই যেন চুপ করে রইল। তখন বাইরে আবারও ঝুম বৃষ্টি নেমেছে। ছেলেগুলো চলে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, কিন্তু বৃষ্টি দেখে লোভ সামলাতে পারলো না। কোত্থেকে যেন একটা ফুটবলও জোগাড় হয়ে গেল। শুরু হয়ে গেল বৃষ্টিতে ফুটবল খেলা।
আর একটু দূরে বসে কলেজ বারান্দার বেঞ্চে সাইফ আর সিনথিয়া বসে চুপচাপ তাকিয়ে খেলা দেখছে। যেন এক জোড়া চড়ুই গাছের ডালে বসে আছে। পার্থক্য এতটুকুই, তাদের কারোরই খেলায় মন নেই। যে কেউ দেখলে ভাববে কতো রোমান্টিক একটা মূহুর্ত। কিন্তু এখানেই যেন প্রকৃতির রহস্যময়তা খেলা করে। এই পরিবেশে দু’জন একসঙ্গে বসে আছে ঠিকই, কিন্তু দু’জনের মনেই রয়েছে নিজস্ব কষ্ট। একান্তই নিজস্ব কিছু না পাওয়ার বেদনা।
(পর্ব ১১)


Pingback: গল্পঃ My Best Friend Simi (পর্ব ৯) | আমিনুল ইসলাম সজীবের বাংলা ব্লগ
“এই পরিবেশে দু’জন একসঙ্গে বসে আছে ঠিকই, কিন্তু দু’জনের মনেই রয়েছে নিজস্ব কষ্ট। একান্তই নিজস্ব কিছু না পাওয়ার বেদনা।”
মনে হচ্ছে যেন আমার নিজের কথা গুলো কে যেন উপন্যাস করে ন্যারেট করছে।
কার লেখা?
আমার ব্লগে আর কার লেখা থাকবে?